আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে পাঁচ দফা দাবি এনসিপির
গুমের শিকার ব্যক্তিদের সন্ধান, পরিবারের কাছে সত্য প্রকাশ ও স্বাধীন তদন্তের ওপর জোর
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে গুমের শিকার ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা, তাঁদের পরিবারের কাছে ঘটনার সত্য তুলে ধরা এবং প্রতিটি ঘটনার বিচার নিশ্চিত করাসহ পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
দলটি মনে করে, গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কার্যকর বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ বন্ধ করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে গুমের অভিযোগের তদন্ত এমন একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করার দাবি জানিয়েছে দলটি, যার ওপর অভিযুক্ত কোনো বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।
এক নজরে এনসিপির দাবিগুলো
- গুমের শিকার ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা
- পরিবারের কাছে ঘটনার সত্য প্রকাশ করা
- প্রতিটি গুমের ঘটনার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা
- স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তব্যবস্থা নিশ্চিত করা
- গুম প্রতিরোধে কার্যকর আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা
গুমের শিকারদের সন্ধানের দাবি
এনসিপির দাবির প্রথম দিকটি হলো, অতীতে নিখোঁজ বা গুমের শিকার ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত করে তাঁদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ জোরদার করা। যারা এখনো নিখোঁজ, তাঁদের জীবিত থাকার সম্ভাবনা, মৃত্যুর ঘটনা বা তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে রাষ্ট্রকে নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে হবে বলে দলটি মনে করে।
সম্প্রতি এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও গুমের শিকার ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা এবং তাঁদের পরিবারের কাছে সত্য তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। মোংলায় গুমের শিকার মিরাজ শেখসহ আওয়ামী লীগ আমলে নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপের দাবিও তিনি জানিয়েছেন।
পরিবারগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
একজন মানুষ কোথায় আছেন—এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর বছরের পর বছর না পাওয়া পরিবারের জন্য গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করে। এনসিপি বলছে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নিখোঁজ ব্যক্তির প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে পরিবারকে স্পষ্ট তথ্য দেওয়া।
পরিবারের কাছে সত্য প্রকাশের দাবি
গুমের ঘটনায় শুধু নিখোঁজ ব্যক্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হন না; দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন তাঁর পরিবারের সদস্যরাও। প্রিয়জন জীবিত নাকি মৃত—এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া তাঁদের জন্য দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ও সামাজিক সংকট তৈরি করে।
এনসিপির অবস্থান হলো, প্রতিটি ঘটনার প্রকৃত তথ্য অনুসন্ধান করে সংশ্লিষ্ট পরিবারের কাছে তা প্রকাশ করতে হবে। কোনো ঘটনা আড়াল না করে সত্য উদ্ঘাটনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ওপরও দলটি গুরুত্ব দিচ্ছে।
প্রতিটি ঘটনার বিচার চায় দলটি
গুমের অভিযোগের তদন্তের পাশাপাশি অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে এনসিপি। দলটির মতে, শুধু নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান করাই যথেষ্ট নয়; যারা এই ধরনের অপরাধে জড়িত, তাদেরও জবাবদিহির মুখোমুখি করতে হবে।
নাহিদ ইসলাম বলেছেন, গুমের প্রতিটি ঘটনায় স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে দেশে গুমের সংস্কৃতির স্থায়ী অবসান সম্ভব নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সত্য উদ্ঘাটন, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির মাধ্যমেই মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
শুধু তদন্ত নয়, বিচারও জরুরি
কোনো ঘটনার তদন্ত হলেও যদি অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিচার না হয়, তাহলে ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত থাকে। তাই তদন্তের পাশাপাশি দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করার দাবিও সামনে এসেছে।
অভিযুক্ত বাহিনী দিয়ে তদন্ত নয়
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার নিয়ে প্রস্তাবিত আইনের তদন্তব্যবস্থা নিয়ে আগেও আপত্তি জানিয়েছে এনসিপি। দলটির অভিযোগ, কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে একই বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন কাঠামো দিয়ে তদন্ত করা হলে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
এ কারণে পুলিশ, সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা অন্য কোনো নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের চেইন অব কমান্ডের বাইরে থাকা একটি স্বাধীন তদন্ত সংস্থা গঠনের দাবি জানিয়েছে দলটি।
স্বাধীন তদন্ত কেন গুরুত্বপূর্ণ?
যে প্রতিষ্ঠানের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠানের ওপর তদন্তের দায়িত্ব থাকলে নিরপেক্ষতা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে। এনসিপি তাই বাহিনীগুলোর সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে স্বাধীন তদন্ত কাঠামোর দাবি করছে।
প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ আইন নিয়েও আপত্তি
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া নিয়ে আগস্টের শুরুতেই আপত্তি জানিয়েছিল এনসিপি। দলটির বক্তব্য ছিল, খসড়ায় তদন্তের কাঠামো যথেষ্ট স্বাধীন না হলে এটি গুমের ঘটনায় কার্যকর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে দায়মুক্তির সুযোগ তৈরি করতে পারে।
এনসিপি বিশেষভাবে খসড়ার ১৪ ধারার পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছিল। তাদের মতে, গুমের অভিযোগ তদন্তের জন্য এমন একটি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, যার হাতে স্বাধীনভাবে তদন্ত করার পর্যাপ্ত আইনি ক্ষমতা ও সক্ষমতা থাকবে।
আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার কথাও বলছে এনসিপি
গুম প্রতিরোধে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের বিষয়টিও সামনে এনেছে এনসিপি। দলটির বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০২৪ সালের আগস্টে International Convention for the Protection of All Persons from Enforced Disappearance-এ যোগ দিয়েছে। এই কাঠামোর অধীনে গুমের অভিযোগ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
এনসিপির মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ আইন প্রণয়নের সময় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। বিশেষ করে তদন্তব্যবস্থার স্বাধীনতা ও ভুক্তভোগী পরিবারের অধিকার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
৩০ আগস্ট কেন গুরুত্বপূর্ণ?
জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রতি বছর ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালন করা হয়। দিনটি গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের প্রতি সংহতি প্রকাশের পাশাপাশি জোরপূর্বক গুমের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্বের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেয়।
বাংলাদেশেও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, রাজনৈতিক দল ও ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে দিনটিতে গুমের ঘটনা তদন্ত, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং বিচারের দাবি তোলা হচ্ছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবিও সামনে
গুমের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের প্রধান দাবি হলো—তাঁদের স্বজনদের কী হয়েছে, সে বিষয়ে রাষ্ট্রকে সত্য জানাতে হবে। কেউ জীবিত থাকলে তাঁকে উদ্ধার করতে হবে; আর মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে পরিবারের কাছে মরদেহ বা মৃত্যুর নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছে দিতে হবে।
মানবাধিকার সংগঠন ও ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতিনিধিরাও প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ আইনে স্বাধীন তদন্তের বিধান শক্তিশালী করার দাবি জানিয়েছেন। সাম্প্রতিক আলোচনায় খসড়া আইনের কয়েকটি ধারা সংশোধনের দাবিও উঠে এসেছে।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু
গুমের অভিযোগের তদন্ত কে করবে?—এই প্রশ্নটিই বর্তমানে আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভুক্তভোগী ও মানবাধিকারকর্মীদের একটি অংশ স্বাধীন তদন্ত সংস্থা চাচ্ছেন, যাতে কোনো নিরাপত্তা বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেই বাহিনী তদন্তের নিয়ন্ত্রণে না থাকে।
রাষ্ট্রের জন্য চ্যালেঞ্জ
গুমের অভিযোগের বিচার ও তদন্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা। ভুক্তভোগী পরিবার যদি তদন্তপ্রক্রিয়াকে নিরপেক্ষ মনে না করে, তাহলে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের ওপর আস্থাও তৈরি হবে না।
এ কারণে তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা, সাক্ষী ও ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা, নথি ও প্রমাণ সংরক্ষণ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।
এনসিপির বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য
গুমের বিচার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্নটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত ও বিচার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানও সামনে আসছে।
এনসিপি তাদের দাবির মাধ্যমে গুমের বিচারকে শুধু অতীতের ঘটনা হিসেবে না দেখে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ ঠেকাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের সঙ্গেও বিষয়টিকে যুক্ত করছে।
শেষ কথা
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে এনসিপির পাঁচ দফা দাবির কেন্দ্রে রয়েছে সত্য উদ্ঘাটন, ভুক্তভোগীদের সন্ধান, বিচার এবং স্বাধীন তদন্ত। দলটির মতে, গুমের মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করা কঠিন হবে। এখন মূল প্রশ্ন হলো—গুমের অভিযোগ তদন্তে কতটা স্বাধীন কাঠামো তৈরি করা হবে এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবার কত দ্রুত সত্য ও ন্যায়বিচার পাবে।
সারসংক্ষেপ: আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে এনসিপি গুমের শিকার ব্যক্তিদের সন্ধান, পরিবারের কাছে সত্য প্রকাশ, দ্রুত বিচার, স্বাধীন তদন্ত এবং কার্যকর আইন ও জবাবদিহির ওপর জোর দিয়েছে। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ আইনের তদন্তব্যবস্থাকে আরও স্বাধীন ও কার্যকর করার দাবি জানিয়েছে দলটি।
তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা, প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, আল জাজিরা, UNB এবং সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার প্রতিবেদন।

