ঢাকার যানজট কমাতে বড় সিদ্ধান্ত, কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেট যাবে গাবতলী
ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে, গাবতলী টার্মিনাল সম্প্রসারণ; চার মাসের মধ্যে ETC চালুর নির্দেশ
রাজধানীর দীর্ঘদিনের যানজট কমাতে কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেট গাবতলীতে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর, গাবতলী বাস টার্মিনালের পেছনের অংশ সম্প্রসারণ এবং রাজধানীর এক্সপ্রেসওয়ে ও ফ্লাইওভারের টোল প্লাজায় ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন বা ETC ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
শনিবার (২৯ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ঢাকার যানজট, গণপরিবহন, বাস টার্মিনাল, পার্কিং ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকের বড় সিদ্ধান্তগুলো
- কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেট গাবতলীতে সরানো হবে।
- ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর করা হবে।
- ঝিলমিল প্রকল্প এলাকায় চার মাসের মধ্যে অস্থায়ী বাস টার্মিনাল তৈরির উদ্যোগ।
- গাবতলী বাস টার্মিনাল সম্প্রসারণ করা হবে।
- এক্সপ্রেসওয়ে ও ফ্লাইওভারে ETC ব্যবস্থা চালু করা হবে।
- ETC ব্যবস্থার জন্য একটি অ্যাপ তৈরি করা হবে।
- অটোরিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণে আলাদা নীতিমালা করা হবে।
কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেট কেন সরানো হচ্ছে?
কারওয়ান বাজার রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা। এখানে কাঁচাবাজার ও পাইকারি পণ্যের বড় বাজার থাকায় প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ক্রেতা, বিক্রেতা, পণ্যবাহী যান ও অন্যান্য যানবাহনের চলাচল থাকে। এর প্রভাব আশপাশের সড়কের যান চলাচলেও পড়ে।
সরকারের পরিকল্পনা হলো, কিচেন মার্কেটটি গাবতলীতে সরিয়ে নিলে কারওয়ান বাজারের ওপর থেকে বাজারকেন্দ্রিক যানবাহনের চাপ কমবে। একই সঙ্গে সড়ক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এনে ব্যস্ত এলাকাটিতে যান চলাচল আরও স্বাভাবিক করার সুযোগ তৈরি হবে বলে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
কারওয়ান বাজারে সম্ভাব্য পরিবর্তন
কিচেন মার্কেট অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হলে বাজারকেন্দ্রিক পণ্যবাহী যান ও ক্রেতাদের চাপ কমানোর মাধ্যমে কারওয়ান বাজারের সড়ক ব্যবস্থাপনায় নতুনভাবে পরিকল্পনা করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালও যাবে কেরানীগঞ্জে
যানজট কমানোর পরিকল্পনায় শুধু কিচেন মার্কেট নয়, বাস টার্মিনাল ব্যবস্থাপনাতেও বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্থায়ী টার্মিনাল নির্মাণে সময় লাগবে। তাই এর আগেই কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল প্রকল্পের ১৫ একর জমিতে একটি অস্থায়ী বাস টার্মিনাল তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আগামী চার মাসের মধ্যে এই অস্থায়ী টার্মিনাল নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিতে বলা হয়েছে।
পরিকল্পনাটির মূল উদ্দেশ্য হলো রাজধানীর কেন্দ্রীয় অংশে আন্তজেলা বাসের চাপ কমানো। ফুলবাড়িয়ার বর্তমান অবস্থান থেকে টার্মিনাল সরানো গেলে কেন্দ্রীয় ঢাকার ওপর বাস ও যাত্রীবাহী যানবাহনের চাপ কিছুটা কমতে পারে বলে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
গাবতলী বাস টার্মিনালও বড় হবে
অন্যদিকে গাবতলী বাস টার্মিনালের পেছনের অংশ সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে টার্মিনালের ধারণক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাস ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হবে।
বাস টার্মিনাল পরিকল্পনা একসঙ্গে
- ফুলবাড়িয়া টার্মিনাল → কেরানীগঞ্জে স্থানান্তর
- ঝিলমিলে ১৫ একর জমিতে → অস্থায়ী টার্মিনাল
- গাবতলী টার্মিনাল → পেছনের অংশ সম্প্রসারণ
- লক্ষ্য → কেন্দ্রীয় ঢাকায় বাসের চাপ কমানো
চার মাসের মধ্যে ETC চালুর নির্দেশ
ঢাকার সড়ক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর অংশ হিসেবে এক্সপ্রেসওয়ে ও ফ্লাইওয়ের টোল প্লাজাগুলোতে Electronic Toll Collection (ETC) ব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বর্তমান টোল আদায়ের পদ্ধতির তুলনায় ETC ব্যবস্থায় যানবাহন থামিয়ে বা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা না করেই টোল আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে টোল প্লাজার সামনে যানবাহনের সারি ও সময়ক্ষেপণ কমানোর সম্ভাবনা থাকে।
এ জন্য একটি বিশেষ অ্যাপ তৈরিরও সিদ্ধান্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চার মাসের মধ্যে অ্যাপ তৈরির কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ETC কীভাবে কাজে আসতে পারে?
ইলেকট্রনিক টোল ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো টোল আদায়ের প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও প্রযুক্তিনির্ভর করা। টোল প্লাজায় যানবাহনের অপেক্ষার সময় কমানো গেলে নির্দিষ্ট পয়েন্টে অপ্রয়োজনীয় যানজটও কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান উড়ালসড়ক নিয়েও নতুন উদ্যোগ
যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান উড়ালসড়কের আশপাশের দীর্ঘদিনের যানজট নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) আগে যে প্রতিবেদন তৈরি করেছিল, সেটি আবার পর্যালোচনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বুয়েটকে বিদ্যমান প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে নতুন সুপারিশসহ একটি প্রতিবেদন ১৫ দিনের মধ্যে জমা দিতে বলা হয়েছে। পরবর্তী কার্যক্রমে সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশকে সমন্বিতভাবে কাজ করার কথা বলা হয়েছে।
সচিবালয়ের আশপাশে পার্কিং বাড়ানোর পরিকল্পনা
রাজধানীর যানজটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে পার্কিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও আলোচনায় এসেছে। সচিবালয়কেন্দ্রিক যানবাহনের চাপ কমাতে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে পার্কিং সুবিধা তৈরির সম্ভাবনা যাচাই করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এর পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী আরও বিকল্প পার্কিং এলাকা খুঁজে বের করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য হলো সচিবালয়ের চারপাশের সড়কে পার্ক করা যানবাহনের চাপ কমিয়ে চলাচল স্বাভাবিক রাখা।
অটোরিকশার জন্য আলাদা নীতিমালা
রাজধানীর অটোরিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনায় নতুন নীতিমালা তৈরির সিদ্ধান্তও হয়েছে। এর মাধ্যমে কোন এলাকায় কীভাবে অটোরিকশা চলবে, চলাচল কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে এবং নগর পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে এর সমন্বয় কীভাবে করা হবে—এসব বিষয় একটি কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
এ ছাড়া অনুমোদনহীন ডাবল ডেকার স্লিপার বাস চলাচলের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শুধু রাস্তা নয়, সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ওপর জোর
বৈঠকের সিদ্ধান্তগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যায়, যানজট মোকাবিলায় সরকার শুধু নতুন রাস্তা বা অবকাঠামো নির্মাণের ওপর নির্ভর করতে চাইছে না। বরং বাজার, বাস টার্মিনাল, পার্কিং, টোল ব্যবস্থা, অটোরিকশা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা—সবকিছুকে একই পরিকল্পনার মধ্যে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ঢাকার ভেতরে আন্তজেলা বাস ও বড় বাজারকেন্দ্রিক যান চলাচল কমিয়ে শহরের বাইরের দিকে চাপ সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা এ উদ্যোগগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে যেসব কাজে
| ETC অ্যাপ | ৪ মাস |
| ঝিলমিলের অস্থায়ী বাস টার্মিনাল | ৪ মাস |
| বুয়েটের যানজট বিশ্লেষণ | ১৫ দিন |
বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
ঢাকার যানজট কমাতে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে টার্মিনাল স্থানান্তর, বাজার পুনর্বিন্যাস, পার্কিং ব্যবস্থার উন্নয়ন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এসব পরিকল্পনার কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করে সময়মতো বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ওপর।
এবারের বৈঠকে বেশ কিছু উদ্যোগের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া হয়েছে। ফলে পরিকল্পনাগুলো কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে কি না, নাকি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবে রূপ নেয়—সেদিকেই এখন নজর থাকবে।
সারসংক্ষেপ
কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেট গাবতলীতে স্থানান্তর, ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল কেরানীগঞ্জে নেওয়া এবং গাবতলী টার্মিনাল সম্প্রসারণ—এই তিনটি উদ্যোগ ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এর সঙ্গে ETC, নতুন পার্কিং ব্যবস্থা, অটোরিকশার নীতিমালা এবং যানজটপ্রবণ এলাকাগুলো নিয়ে নতুন সমীক্ষা যুক্ত হওয়ায় সরকার এবার রাজধানীর যানজটকে একাধিক দিক থেকে মোকাবিলা করার পরিকল্পনা নিয়েছে।
তবে এসব উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে দ্রুত বাস্তবায়ন, সঠিক পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কার্যকর সমন্বয়ের ওপর।

