কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা:নদীভাঙন, দারিদ্র্য আর বন্যার সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করা কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের মানুষের কাছে ঈদুল আজহা অনেক সময় শুধুই একটি নামাজের দিনের নাম। কোরবানির আনন্দ সেখানে বিলাসিতা। বছরের পর বছর অনেক পরিবার ঈদের দিনেও গরুর মাংসের স্বাদ পায় না। তবে এবার সেই নিরানন্দ ঈদে মানবিকতার আলো হয়ে পাশে দাঁড়ালেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী দম্পতি মো. আসাদুজ্জামান আনসারী ও অ্যাডভোকেট নূর উন নাহার আনসারী। তাঁদের উদ্যোগে দুটি গরু কোরবানি হওয়ায় শতাধিক পরিবারে ফিরেছে ঈদের হাসি।
উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের বতুয়াতলি, বালাডোবার চর এবং পাশের সাহেবের আলগা ইউনিয়নের সাতাশ দাগের চর ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ পরিবার এবার কোরবানি দিতে পারেনি। কোথাও একটি ছাগল কোরবানি হয়েছে, আবার কোথাও সেটিও হয়নি। অনেকেই ঈদের দিন ব্রয়লার মুরগি রান্না করে সন্তানদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেছেন, কেউ তাও পারেননি।
এমন বাস্তবতায় আনসারী দম্পতির দেওয়া কোরবানির মাংস যেন ঈদের প্রকৃত আনন্দ হয়ে পৌঁছায় চরবাসীর ঘরে ঘরে। কোরবানিবঞ্চিত পরিবারগুলোর হাতে এক কেজি করে মাংস তুলে দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন পর গরুর মাংস রান্না হয়েছে অনেক ঘরে।বতুয়াতলি গ্রামের বাসিন্দা মো.সুরুতজামাল আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন,
“নদীভাঙনে ভাঙতে ভাঙতে আমরা একেবারে শেষ। ঈদের নামাজ পড়ার পরও মনে কোনো আনন্দ ছিল না। আনসারী পরিবার গরু কোরবানি দেওয়ায় এবার অন্তত বাচ্চাগো মুখে গোশত তুলতে পারমু। এইডাই আমাদের বড় ঈদ।”
বালাডোবার চরের বাসিন্দা মজিবর রহমান বলেন,“চরে কোনো কোরবানি ছিল না। যার একটু সামর্থ্য আছে, সে বাজার থেইকা মুরগি কিনছে। অনেকেই সেটাও পারে নাই। পরে আনসারী পরিবারের দেওয়া গোশত পাইয়া মনে হইছে—ঈদ গরিবের জন্যও আছে।”
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কুড়িগ্রামের প্রায় সাড়ে চার শতাধিক চরে পাঁচ লাখের বেশি মানুষের বসবাস। নদীভাঙন আর বন্যা এখানে মানুষের নিত্যসঙ্গী। কেউ মাছ ধরে, কেউ কৃষিশ্রমিক, কেউ দূরের শহরে গিয়ে শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। জীবনসংগ্রামের এই বাস্তবতায় কোরবানি অনেক পরিবারের কাছেই অধরাই থেকে যায়।
বেগমগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. বাবলু মিয়া বলেন,
“বালাডোবার চর, মুসার চর ও বতুয়াতলি ইউনিয়নের সবচেয়ে দরিদ্র এলাকা। সরকারি সহায়তা সীমিত। এই অবস্থায় ব্যক্তি উদ্যোগে আনসারী দম্পতি গরু কোরবানি দিয়ে মানুষের মুখে হাসি ফোটিয়েছেন। সমাজের সামর্থ্যবানরা এভাবে এগিয়ে এলে গরিব মানুষের ঈদও আনন্দময় হবে।”
মো. আসাদুজ্জামান আনসারী বলেন,
“গত কয়েক বছর ধরেই আমরা বিভিন্ন চরে কোরবানি দিয়ে আসছি। এবার দুটি গরু কোরবানি করেছি। আল্লাহ সামর্থ্য দিলে ভবিষ্যতেও এই কার্যক্রম চালিয়ে যেতে চাই।”
তিনি আরও বলেন,
“ভালো কাজের প্রচার হলে অন্যরাও উৎসাহিত হন। আমিও একসময় অন্য একজনকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। কোরবানি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করি, তবে প্রকৃত অভাবী মানুষের হাতে মাংস তুলে দিতে পারলে আত্মতৃপ্তি লাগে।”
চরের সেই নিরানন্দ দুপুরে যখন ধোঁয়া উঠছিল মাটির চুলায়, তখন অনেক শিশুর চোখে-মুখে ছিল ঈদের প্রকৃত হাসি। আর সেই হাসির পেছনে ছিল দুই মানুষের নীরব মানবিকতা।

বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ মে ২০২৬
কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা:নদীভাঙন, দারিদ্র্য আর বন্যার সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করা কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের মানুষের কাছে ঈদুল আজহা অনেক সময় শুধুই একটি নামাজের দিনের নাম। কোরবানির আনন্দ সেখানে বিলাসিতা। বছরের পর বছর অনেক পরিবার ঈদের দিনেও গরুর মাংসের স্বাদ পায় না। তবে এবার সেই নিরানন্দ ঈদে মানবিকতার আলো হয়ে পাশে দাঁড়ালেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী দম্পতি মো. আসাদুজ্জামান আনসারী ও অ্যাডভোকেট নূর উন নাহার আনসারী। তাঁদের উদ্যোগে দুটি গরু কোরবানি হওয়ায় শতাধিক পরিবারে ফিরেছে ঈদের হাসি।
উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের বতুয়াতলি, বালাডোবার চর এবং পাশের সাহেবের আলগা ইউনিয়নের সাতাশ দাগের চর ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ পরিবার এবার কোরবানি দিতে পারেনি। কোথাও একটি ছাগল কোরবানি হয়েছে, আবার কোথাও সেটিও হয়নি। অনেকেই ঈদের দিন ব্রয়লার মুরগি রান্না করে সন্তানদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেছেন, কেউ তাও পারেননি।
এমন বাস্তবতায় আনসারী দম্পতির দেওয়া কোরবানির মাংস যেন ঈদের প্রকৃত আনন্দ হয়ে পৌঁছায় চরবাসীর ঘরে ঘরে। কোরবানিবঞ্চিত পরিবারগুলোর হাতে এক কেজি করে মাংস তুলে দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন পর গরুর মাংস রান্না হয়েছে অনেক ঘরে।বতুয়াতলি গ্রামের বাসিন্দা মো.সুরুতজামাল আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন,
“নদীভাঙনে ভাঙতে ভাঙতে আমরা একেবারে শেষ। ঈদের নামাজ পড়ার পরও মনে কোনো আনন্দ ছিল না। আনসারী পরিবার গরু কোরবানি দেওয়ায় এবার অন্তত বাচ্চাগো মুখে গোশত তুলতে পারমু। এইডাই আমাদের বড় ঈদ।”
বালাডোবার চরের বাসিন্দা মজিবর রহমান বলেন,“চরে কোনো কোরবানি ছিল না। যার একটু সামর্থ্য আছে, সে বাজার থেইকা মুরগি কিনছে। অনেকেই সেটাও পারে নাই। পরে আনসারী পরিবারের দেওয়া গোশত পাইয়া মনে হইছে—ঈদ গরিবের জন্যও আছে।”
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কুড়িগ্রামের প্রায় সাড়ে চার শতাধিক চরে পাঁচ লাখের বেশি মানুষের বসবাস। নদীভাঙন আর বন্যা এখানে মানুষের নিত্যসঙ্গী। কেউ মাছ ধরে, কেউ কৃষিশ্রমিক, কেউ দূরের শহরে গিয়ে শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। জীবনসংগ্রামের এই বাস্তবতায় কোরবানি অনেক পরিবারের কাছেই অধরাই থেকে যায়।
বেগমগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. বাবলু মিয়া বলেন,
“বালাডোবার চর, মুসার চর ও বতুয়াতলি ইউনিয়নের সবচেয়ে দরিদ্র এলাকা। সরকারি সহায়তা সীমিত। এই অবস্থায় ব্যক্তি উদ্যোগে আনসারী দম্পতি গরু কোরবানি দিয়ে মানুষের মুখে হাসি ফোটিয়েছেন। সমাজের সামর্থ্যবানরা এভাবে এগিয়ে এলে গরিব মানুষের ঈদও আনন্দময় হবে।”
মো. আসাদুজ্জামান আনসারী বলেন,
“গত কয়েক বছর ধরেই আমরা বিভিন্ন চরে কোরবানি দিয়ে আসছি। এবার দুটি গরু কোরবানি করেছি। আল্লাহ সামর্থ্য দিলে ভবিষ্যতেও এই কার্যক্রম চালিয়ে যেতে চাই।”
তিনি আরও বলেন,
“ভালো কাজের প্রচার হলে অন্যরাও উৎসাহিত হন। আমিও একসময় অন্য একজনকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। কোরবানি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করি, তবে প্রকৃত অভাবী মানুষের হাতে মাংস তুলে দিতে পারলে আত্মতৃপ্তি লাগে।”
চরের সেই নিরানন্দ দুপুরে যখন ধোঁয়া উঠছিল মাটির চুলায়, তখন অনেক শিশুর চোখে-মুখে ছিল ঈদের প্রকৃত হাসি। আর সেই হাসির পেছনে ছিল দুই মানুষের নীরব মানবিকতা।

আপনার মতামত লিখুন