সিংড়া উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রওনক হাসান হারুন গ্রেপ্তার, গুলশানের মামলায় কারাগারে
ঢাকা: নাটোরের সিংড়া উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রওনক হাসান হারুনকে রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তারের পর গুলশান থানায় দায়ের করা মামলায় আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। রাজধানীর গুলশানে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একটি ঝটিকা মিছিলকে কেন্দ্র করে দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
সাম্প্রতিক একটি আদালত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে সিংড়া উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদককে ‘হারুন বাসার’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ২০২২ সালে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে একই পদে থাকা নেতার নাম রওনক হাসান হারুন হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। ফলে নামের বানান বা পরিচিতির ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে।
মিরপুরের ভাড়া বাসা থেকে গ্রেপ্তারের দাবি
স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রওনক হাসান হারুন ঢাকার মিরপুর-১ এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। ১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১২টার দিকে সিভিল পোশাকে থাকা ৭ থেকে ৮ জনের একটি দল ওই বাসায় গিয়ে তাকে আটক করে বলে তার পরিচিতজনদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তারা নিজেদের গোয়েন্দা পুলিশ বা ডিবির সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে।
তবে গ্রেপ্তারের এই বিস্তারিত প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রকাশিত সরকারি বা পুলিশের বক্তব্য এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তাই সিভিল পোশাকে থাকা ব্যক্তিরা ডিবির সদস্য ছিলেন কি না, সে বিষয়টি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পরদিন তাকে গুলশান থানায় সোপর্দ করা হয়। এরপর গুলশান থানার মামলায় তাকে আদালতে হাজির করা হয়।
গুলশানের ঝটিকা মিছিলের মামলা
সাম্প্রতিক আদালত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলশানে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একটি ঝটিকা মিছিল হয়। পুলিশ জানিয়েছিল, ওই মিছিলে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জন অংশ নিয়েছিলেন। পরে পুলিশ ধাওয়া দিয়ে এবং রাবার বুলেট ছুড়ে মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
পুলিশের দাবি অনুযায়ী, ওই সময় মিছিল থেকে হাতবোমা নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে। ঘটনার পর গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা করা হয়। মামলাটিতে ১১৮ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং আরও ৮০ থেকে ১০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্যে গুলশানে জড়ো হয়েছিলেন। পুলিশ আরও দাবি করেছে, সেখানে সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান দেওয়া এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়।
মামলার তথ্য: প্রকাশিত প্রতিবেদনে মামলাটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করার কথা বলা হয়েছে। মামলায় ১১৮ জনের নাম উল্লেখের পাশাপাশি ৮০ থেকে ১০০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
আদালতের আদেশে কারাগারে
১ অক্টোবর ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জোনাইদ আসামিদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই দিন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও গুলশান থানার উপপরিদর্শক মো. রুহুল আমিন আসামিদের আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। আদালত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
একই মামলায় পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বাউফল পৌরসভার সাবেক মেয়র জিয়াউল হক জুয়েলকেও কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
রওনক হাসান হারুনের রাজনৈতিক পরিচয়
রওনক হাসান হারুন সিংড়া উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২২ সালের ১৪ মার্চ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে সিংড়া উপজেলা ছাত্রলীগের সম্মেলনে সভাপতি পদে সজিব ইসলাম জুয়েল এবং সাধারণ সম্পাদক পদে রওনক হাসান হারুন নির্বাচিত হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়।
আরেকটি ২০২২ সালের প্রতিবেদনে একই সম্মেলনের তথ্য দিতে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে হারুন বাসার নাম ব্যবহার করা হয়েছিল। সেখানে সিংড়া উপজেলা ছাত্রলীগের নবনির্বাচিত সভাপতি সজিব ইসলাম জুয়েল ও সাধারণ সম্পাদক হারুন বাসারের নাম উল্লেখ করা হয়।
এ কারণে বর্তমান মামলার আসামি হিসেবে প্রকাশিত ‘হারুন বাসার’ এবং রওনক হাসান হারুন একই ব্যক্তি কি না, তা পুলিশের আনুষ্ঠানিক নথি বা আদালতের কাগজের ভিত্তিতে নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবহারকারীদের দেওয়া তথ্য এবং পূর্ববর্তী সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী নামের মিল থাকলেও সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে এই পার্থক্যটি উল্লেখ করা হলো।
এর আগেও বিভিন্ন ঘটনায় সংবাদে এসেছিলেন
রওনক হাসান হারুনের নাম এর আগেও সিংড়ার বিভিন্ন রাজনৈতিক ও স্থানীয় ঘটনায় সংবাদে এসেছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, কাগজপত্র ও হেলমেট না থাকায় কয়েকটি মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে পুলিশের ব্যবস্থা নেওয়ার পর সিংড়া উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রওনক হাসান হারুনের নেতৃত্বে তার অনুসারীরা থানার সামনে গিয়ে প্রতিবাদ করেন। ওই ঘটনায় থানার ওসি পুলিশের নিয়মিত অভিযান এবং আইন সবার জন্য সমান বলে মন্তব্য করেছিলেন।
এর আগে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে সিংড়ার তাজপুর ইউনিয়নের তেমুক নওগাঁ বাজারে ছাত্রলীগের একটি কার্যালয় নির্মাণকে কেন্দ্র করেও তার নাম সংবাদে আসে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, হাটের জায়গায় নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের হস্তক্ষেপে কাজটি বন্ধ করা হয়। রওনক হাসান হারুন তখন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের অনুমতি নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন বলে দাবি করেছিলেন। চেয়ারম্যান অবশ্য এমন অনুমতি দেওয়ার কথা অস্বীকার করেন।
মামলায় পুলিশের অভিযোগ কী
গুলশান থানার মামলার বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পুলিশ ও মামলার এজাহারের বরাতে বলা হয়েছে, ১১ সেপ্টেম্বরের মিছিলে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং ককটেল বা হাতবোমা নিক্ষেপের অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি ককটেলও জব্দ করা হয়েছিল।
তবে মামলায় আসামি হওয়া বা গ্রেপ্তার হওয়া নিজেই কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার অর্থ নয়। অভিযোগের সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে। রওনক হাসান হারুনের পক্ষ থেকে এ মামলার অভিযোগ সম্পর্কে কোনো বক্তব্য এই প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় পাওয়া যায়নি।
গ্রেপ্তার নিয়ে যে বিষয়টি পরিষ্কার নয়
রওনক হাসান হারুনকে ঠিক কোথা থেকে এবং কোন ইউনিটের সদস্যরা গ্রেপ্তার করেছেন, তা নিয়ে দুটি স্তরের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তার ঘনিষ্ঠদের দেওয়া তথ্যে বলা হয়েছে, মিরপুর-১-এর ভাড়া বাসা থেকে সিভিল পোশাকে থাকা একটি দল তাকে ডিবি পরিচয়ে আটক করে। অন্যদিকে প্রকাশিত আদালত-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে তার গ্রেপ্তারের স্থান বা গ্রেপ্তারকারী দলের বিস্তারিত উল্লেখ নেই।
একইভাবে, আদালত-সংক্রান্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনে মামলাটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে পৃথক বিস্ফোরক আইনের মামলা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। যদিও মামলার অভিযোগে হাতবোমা বা ককটেল নিক্ষেপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাই বিস্ফোরক আইনের পৃথক মামলা হয়েছে কি না, তা আদালতের নথি বা পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
তথ্য যাচাইয়ের নোট: গ্রেপ্তারের সময়, মিরপুরের বাসা থেকে আটকের পদ্ধতি এবং পৃথক বিস্ফোরক মামলার বিষয়ে আরও সরকারি বা আদালত-নথিভিত্তিক তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা প্রয়োজন। বর্তমানে প্রকাশিত সূত্রে নিশ্চিতভাবে পাওয়া তথ্য হলো, গুলশানের ১১ সেপ্টেম্বরের মিছিলকে কেন্দ্র করে করা সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
ঘটনার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া
এখন মামলাটির পরবর্তী কার্যক্রম নির্ভর করবে তদন্ত এবং আদালতের আদেশের ওপর। তদন্ত কর্মকর্তা মামলার অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রমাণ সংগ্রহ করবেন এবং আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি আদালতে উপস্থাপন করবেন। আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্য, নথি এবং অন্যান্য প্রমাণ পর্যালোচনা করে মামলার পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রওনক হাসান হারুনের গ্রেপ্তার সিংড়া ও নাটোরের রাজনৈতিক অঙ্গনেও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে তিনি দীর্ঘদিন উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সক্রিয় থাকায় তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার পরবর্তী আইনি কার্যক্রমের দিকে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের নজর রয়েছে।
যা জানা গেল
- নাম: রওনক হাসান হারুন; সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে ‘হারুন বাসার’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে।
- রাজনৈতিক পরিচয়: সিংড়া উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ২০২২ সালে নির্বাচিত হন।
- গ্রেপ্তার: দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ১ অক্টোবর রাত পৌনে ১২টার দিকে মিরপুর-১-এর ভাড়া বাসা থেকে।
- মামলা: গুলশানের ১১ সেপ্টেম্বরের ঝটিকা মিছিলকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা।
- আদালত: ১ অক্টোবর তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
- অভিযোগ: মিছিল, বিশৃঙ্খলা ও ককটেল বা হাতবোমা নিক্ষেপের অভিযোগ মামলার এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
সর্বশেষ অবস্থা: প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী রওনক হাসান হারুন বর্তমানে গুলশান থানার ওই মামলায় আদালতের আদেশে কারাগারে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।

