সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা: প্রজন্ম লীগ নেতাসহ গ্রেপ্তার ৫
রাজধানীর ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ব্রাউনফিশ স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় গ্রেপ্তারের সংখ্যা বেড়ে পাঁচজনে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের এক নেতাসহ আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।
ইসিবি চত্বরে সালমান মুক্তাদিরের ব্রাউনফিশ স্টুডিওসহ নিউ গিনি প্রপার্টিজ এলাকায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পুলিশ বলছে, জমি-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
প্রজন্ম লীগ নেতাসহ আরও দুজন গ্রেপ্তার
রোববার রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট ও বেইলি রোড এলাকা থেকে শাহ আলম অনিক ও মো. শাহরিয়ারকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে মো. মামুন, আসলাম ও মুন্নাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ফলে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় গ্রেপ্তারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচজনে।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম গ্রেপ্তারের বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, শাহ আলম অনিকের বিরুদ্ধে ওই হামলায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তদন্ত করছে পুলিশ। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।
যেভাবে হামলার ঘটনা ঘটে
শনিবার রাতে রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রপার্টিজ এলাকায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ওই এলাকায় সালমান মুক্তাদিরের ব্রাউনফিশ স্টুডিওসহ কয়েকটি স্থাপনা রয়েছে। হামলার সময় স্টুডিওটির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আসবাবপত্র ও বিভিন্ন সরঞ্জামও ভাঙচুর করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ঘটনার পর সালমান মুক্তাদির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত স্টুডিওর ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি স্টুডিওতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা জানান।
চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলেছিলেন সালমান
হামলার পর সালমান মুক্তাদির অভিযোগ করেন, দুই ট্রাকে করে লোকজন এসে তাঁর স্টুডিওতে হামলা চালায় এবং ব্যাপক ভাঙচুর করে। তিনি হামলার পেছনে চাঁদাবাজির অভিযোগও তোলেন।
তবে হামলার কারণ নিয়ে পুলিশের বক্তব্য ভিন্ন। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি মূলত নিউ গিনি প্রপার্টিজের জমি নিয়ে বিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও হামলার মূল লক্ষ্য ছিল না।
ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশ জানিয়েছে, নিউ গিনি প্রপার্টিজের সঙ্গে আশপাশের জমির মালিকদের বিরোধের জেরে হামলার ঘটনা ঘটে। স্টুডিওটি ওই এলাকায় থাকায় সেটিও ভাঙচুরের শিকার হয়েছে বলে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা।
জমি নিয়ে বিরোধের কথা বলছে পুলিশ
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিউ গিনি প্রপার্টিজ লিমিটেডের জমি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। সেই বিরোধের জেরেই শনিবার রাতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। একই বক্তব্য বিভিন্ন পর্যায়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে একাধিক সংবাদমাধ্যম প্রকাশ করেছে।
বিডিনিউজ২৪-এর প্রতিবেদনে পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি জমিকে কেন্দ্র করে বিরোধমান পক্ষগুলোর সংঘাত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে পুলিশ জানিয়েছে, সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়নি এবং চাঁদাবাজির ঘটনাও তারা পায়নি।
হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে শাহরিয়ারকে গ্রেপ্তার
ঘটনার তদন্তে শাহরিয়ার নামে একজনকে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নিউ গিনি প্রপার্টিজের করা মামলায় তিনি এক নম্বর আসামি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রোববার বেইলি রোড এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, জমি-সংক্রান্ত বিরোধের জেরেই হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে আরও পরিষ্কার হওয়ার কথা।
গ্রেপ্তারদের বিষয়ে তদন্ত চলছে
এ ঘটনায় গ্রেপ্তার পাঁচজনের মধ্যে শাহ আলম অনিককে মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত নেতা হিসেবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার বিরুদ্ধে হামলায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ তদন্ত করছে।
তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় ও অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে যে তথ্য এসেছে, সেগুলোর সবকটি এই মামলায় আদালতে প্রমাণিত হয়েছে এমন দাবি করা হয়নি। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এসব অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
স্টুডিওতে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে
হামলার পর প্রকাশিত ভিডিওতে ব্রাউনফিশ স্টুডিওর বিভিন্ন অংশে ভাঙচুরের চিত্র দেখা যায়। চেয়ার, টেবিল, টেলিভিশনসহ স্টুডিওর বিভিন্ন সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য এসেছে। সালমান মুক্তাদিরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্টুডিওর ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
নিউ গিনি প্রপার্টিজ এলাকায় হামলার সময় আরও কিছু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত ও লুটপাটের শিকার হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
চাঁদাবাজি নাকি জমি নিয়ে বিরোধ, তদন্তে কী বের হয়
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলার কারণ নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। সালমান মুক্তাদিরের পক্ষ থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ সামনে এলেও পুলিশ এখন পর্যন্ত ঘটনাটিকে জমি-সংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে যুক্ত বলে জানিয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও ঘটনাটি নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইসিবি চত্বরের ওই এলাকায় প্রায় ৩৫ কাঠা জমি নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ রয়েছে। একটি পক্ষের সঙ্গে নিউ গিনি প্রপার্টিজ এবং অন্য পক্ষের সঙ্গে একজন অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার কথা প্রাথমিকভাবে উঠে এসেছে।
তবে ঘটনার পূর্ণ কারণ এবং হামলায় কার কী ভূমিকা ছিল, তা তদন্ত শেষ হওয়ার পর আরও স্পষ্ট হতে পারে।
- সালমান মুক্তাদিরের ব্রাউনফিশ স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
- ঘটনায় এখন পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
- শাহরিয়ারকে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
- মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের নেতা শাহ আলম অনিককেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
- পুলিশ ঘটনাটিকে জমি-সংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে যুক্ত বলে জানিয়েছে।
- হামলার প্রকৃত কারণ ও প্রত্যেকের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত চলছে।
তদন্তে এখন নজর কোথায়
সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে হামলার পরিকল্পনা, অংশগ্রহণকারীদের পরিচয়, ভাঙচুর ও লুটপাটের সঙ্গে কারা জড়িত এবং জমি-সংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে ঘটনার সম্পর্ক কতটা, এসব বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং মামলার তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার পূর্ণ চিত্র বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছে পুলিশ।
শেষ কথা: সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত পাঁচজন গ্রেপ্তার হয়েছেন। তবে হামলার পেছনের কারণ নিয়ে সালমান মুক্তাদিরের অভিযোগ এবং পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তাই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো একটি কারণকে চূড়ান্ত হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
সূত্র: কালবেলা, চ্যানেল ২৪, বিডিনিউজ২৪, প্রথম আলো, আজকের পত্রিকা, জাগো নিউজ ও অন্যান্য প্রকাশিত প্রতিবেদন।

