মাগুরায় এক বাড়িতেই বিদ্যুৎ বিল ৫০৬ কোটি টাকা

Avatar
মানচিত্র
30 Sep, 2026• 4 min read• 5 Views
মাগুরায় এক বাড়িতেই বিদ্যুৎ বিল ৫০৬ কোটি টাকা

মাগুরায় ২৩৫ ইউনিটের বিদ্যুৎ বিল ৫০৬ কোটি টাকা, ভুল ধরা পড়তেই নামল ১,৯৬৩ টাকায়

মাগুরা: এক মাসে বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছেন মাত্র ২৩৫ ইউনিট। অথচ সেই ব্যবহারের বিপরীতে এক গ্রাহকের হাতে পৌঁছেছে ৫০৬ কোটি ৮৩ লাখ ১১ হাজার ৫৯৩ টাকার বিদ্যুৎ বিল। অস্বাভাবিক এই বিল দেখে মাগুরার সদর উপজেলার কেচুয়াডুবি গ্রামের ওই পরিবারে তৈরি হয় বিস্ময় ও উদ্বেগ। পরে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ভুলটি শনাক্ত করে বিল সংশোধন করেছে। সংশোধিত হিসাবে ওই গ্রাহকের প্রকৃত বিল দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ হাজার ৯৬৩ টাকা।

এক নজরে ঘটনা
  • বিদ্যুৎ ব্যবহার: ২৩৫ ইউনিট
  • ভুল বিল: ৫০৬ কোটি ৮৩ লাখ ১১ হাজার ৫৯৩ টাকা
  • ডিমান্ড চার্জ: ৪৮২ কোটি ৬৯ লাখ ৬৩ হাজার ৪২২ টাকা
  • ভ্যাট: ২৪ কোটি ১৩ লাখ ৪৮ হাজার ১৭১ টাকা
  • প্রকৃত বিল: ১ হাজার ৯৬৩ টাকা
  • ভুলের কারণ: মিটার পরিবর্তনের সময় সিল নম্বরের ডিজিট ভুল ঘরে পোস্টিং

মাত্র ২৩৫ ইউনিট ব্যবহারে ৫০৬ কোটি টাকার বিল

ঘটনাটি মাগুরা সদর উপজেলার মঘি ইউনিয়নের কেচুয়াডুবি গ্রামে। ওই গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শহীদুল ইসলামের স্ত্রী মোছা. আলেয়া খাতুনের নামে সেপ্টেম্বর মাসের বিদ্যুৎ বিলটি ইস্যু করা হয়। বিল হাতে পাওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা অস্বাভাবিক অঙ্কটি দেখে বিস্মিত হন।

বিলের তথ্য অনুযায়ী, আগের রিডিং ছিল ১৬০ ইউনিট। পরবর্তী রিডিং দাঁড়ায় ৩৯৫ ইউনিটে। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট সময়ে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়েছে ২৩৫ ইউনিট। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহারের স্বাভাবিক হিসাবে বিল হওয়ার কথা ছিল ১ হাজার ৯৬৩ টাকা।

কিন্তু বিলের ডিমান্ড চার্জের ঘরে যুক্ত হয় কয়েকশ কোটি টাকার অঙ্ক। এর সঙ্গে ভ্যাট যোগ হওয়ায় মোট বিল গিয়ে দাঁড়ায় ৫০৬ কোটি টাকার বেশি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশিত বিলের কপি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও এই অস্বাভাবিক হিসাবের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। 

ডিমান্ড চার্জই ছিল ৪৮২ কোটি টাকা

বিলের সবচেয়ে বড় অস্বাভাবিকতা ছিল ডিমান্ড চার্জে। ২৩৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিপরীতে সেখানে ৪৮২ কোটি ৬৯ লাখ ৬৩ হাজার ৪২২ টাকা দেখানো হয়। এরপর ভ্যাট হিসেবে যুক্ত হয় আরও ২৪ কোটি ১৩ লাখ ৪৮ হাজার ১৭১ টাকা। মিটার ভাড়াসহ সব মিলিয়ে মোট বিল দাঁড়ায় ৫০৬ কোটি ৮৩ লাখ ১১ হাজার ৫৯৩ টাকা। 

বিলের হিসাব

২৩৫ ইউনিট ব্যবহার → প্রকৃত বিল: ১,৯৬৩ টাকা

ডিমান্ড চার্জ: ৪৮২,৬৯,৬৩,৪২২ টাকা

ভ্যাট: ২৪,১৩,৪৮,১৭১ টাকা

মিটার ভাড়াসহ মোট ভুল বিল: ৫০৬,৮৩,১১,৫৯৩ টাকা

কীভাবে তৈরি হলো এত বড় ভুল?

মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনাটি বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রকৃত হিসাবের কারণে হয়নি। বরং মিটার পরিবর্তনের সময় তথ্য পোস্টিংয়ের ভুলের কারণে অস্বাভাবিক বিলটি তৈরি হয়।

মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আড়পাড়া জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মো. রেজাউল করিমের বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রাহকের মিটার পরিবর্তনের সময় নতুন মিটারের সিল নম্বরের ডিজিট ভুল করে ডিমান্ড চার্জের ঘরে পোস্ট হয়ে যায়। ওই ভুল তথ্যের ভিত্তিতেই সফটওয়্যারে অস্বাভাবিক ডিমান্ড চার্জ তৈরি হয় এবং পরবর্তী সময়ে বিলটি প্রিন্ট হয়ে গ্রাহকের হাতে পৌঁছে যায়। 

মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজারও ঘটনাটিকে টাইপিং বা তথ্য এন্ট্রির ভুল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি নজরে আসার পর বিলটি সংশোধন করা হয়। 

সংশোধনের পর বিল মাত্র ১,৯৬৩ টাকা

অস্বাভাবিক বিল নিয়ে গ্রাহক পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করার পর কর্মকর্তারা বিষয়টি যাচাই করেন। যাচাইয়ে দেখা যায়, ২৩৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাবই সঠিক। ভুল ছিল বিলের ডিমান্ড চার্জের তথ্য এন্ট্রিতে।

এরপর সংশোধিত বিল তৈরি করা হয়। সেখানে গ্রাহকের পরিশোধযোগ্য অর্থ নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৯৬৩ টাকা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশোধিত বিলটি গ্রাহক পরিশোধও করেছেন। 

অর্থাৎ একই গ্রাহকের জন্য প্রথমে যে বিল তৈরি হয়েছিল এবং সংশোধনের পর যে বিল নির্ধারণ করা হয়েছে, তার মধ্যে পার্থক্য কয়েকশ কোটি টাকা। তবে এই বিপুল অঙ্ক প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিল নয়, বরং তথ্য এন্ট্রির ভুল থেকে তৈরি হওয়া একটি বিলিং ত্রুটি।

বিষয়টি নিয়ে তদন্ত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা

এ ধরনের বড় ভুল কীভাবে যাচাই ছাড়াই বিল তৈরির পর্যায়ে চলে গেল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জানিয়েছে, ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব ও ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

২৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার ও বিলিং বিভাগের কর্মীসহ চারজনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার কথা জানানো হয়। কর্তৃপক্ষ বলেছে, তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত পরবর্তী প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে, ঘটনায় মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মো. মহিতুল ইসলামকে তাৎক্ষণিক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই ঘটনায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলে দুঃখ প্রকাশ করেছেন বলে প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে। 

গ্রাহকের জন্য কী ধরনের ভোগান্তি তৈরি হয়েছিল?

একজন আবাসিক গ্রাহকের মাসিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ যখন ২৩৫ ইউনিট, তখন তার নামে ৫০৬ কোটি টাকার বিল আসা স্বাভাবিকভাবেই বড় ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে বিলটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ না করলে আরও বড় অঙ্কের বিলম্ব মাশুল যুক্ত হওয়ার কথা ছিল।

প্রকাশিত বিলের তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ না করলে মোট দাবির পরিমাণ ৫৩০ কোটি ৯৬ লাখ ৫৯ হাজার ৭৬৪ টাকা পর্যন্ত হওয়ার কথা ছিল। তবে সংশোধনের পর প্রকৃত বিলের পরিমাণ ১ হাজার ৯৬৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়। 

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:

৫০৬ কোটি টাকা গ্রাহকের প্রকৃত বিদ্যুৎ খরচের বিল নয়। এটি মিটার পরিবর্তনের সময় তথ্য পোস্টিংয়ের ভুলের কারণে তৈরি হওয়া একটি অস্বাভাবিক বিল। সংশোধনের পর প্রকৃত পরিশোধযোগ্য বিল নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৯৬৩ টাকা।

২৩৫ ইউনিটের হিসাব কীভাবে পাওয়া গেল?

প্রকাশিত বিলের তথ্য অনুযায়ী, ৮ আগস্ট মিটারের রিডিং ছিল ১৬০ ইউনিট। পরবর্তী রিডিং ৮ সেপ্টেম্বর গিয়ে দাঁড়ায় ৩৯৫ ইউনিটে। দুই রিডিংয়ের পার্থক্য ২৩৫ ইউনিট। ফলে সংশ্লিষ্ট মাসে গ্রাহকের বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ ২৩৫ ইউনিট বলেই বিলের রিডিংয়ে প্রতিফলিত হয়েছে। 

এই ব্যবহারের ওপর স্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল, প্রযোজ্য চার্জ ও ভ্যাট হিসাব করলে ৫০৬ কোটি টাকার কোনো অঙ্ক তৈরি হওয়ার সুযোগ নেই। অস্বাভাবিক অঙ্কটি এসেছে ডিমান্ড চার্জের ঘরে ভুল তথ্য চলে যাওয়ার কারণে।

একটি টাইপিং ভুল কীভাবে কোটি টাকার বিল তৈরি করল?

বিদ্যুৎ বিল তৈরির ক্ষেত্রে গ্রাহকের মিটার, রিডিং, অনুমোদিত লোড, ডিমান্ড চার্জ এবং অন্যান্য তথ্য নির্দিষ্ট ঘরে সংরক্ষণ করা হয়। কোনো একটি ঘরে ভুল তথ্য চলে গেলে সফটওয়্যার সেই তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী হিসাব তৈরি করতে পারে।

মাগুরার ঘটনাতেও কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মিটার পরিবর্তনের সময় সিল নম্বরের ডিজিট ডিমান্ড চার্জের ঘরে চলে যাওয়ায় হিসাবের অঙ্ক অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। অর্থাৎ সমস্যাটি বিদ্যুৎ ব্যবহারের রিডিংয়ে নয়, বরং বিল প্রস্তুতের তথ্য এন্ট্রি পর্যায়ে হয়েছে। 

ঘটনার পর যা জানা গেছে

  • গ্রাহকের নাম মোছা. আলেয়া খাতুন।
  • ঠিকানা মাগুরা সদর উপজেলার মঘি ইউনিয়নের কেচুয়াডুবি গ্রাম।
  • সেপ্টেম্বর মাসে বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়েছে ২৩৫ ইউনিট।
  • ভুল বিলের পরিমাণ ছিল ৫০৬ কোটি ৮৩ লাখ ১১ হাজার ৫৯৩ টাকা।
  • ভুল বিলের সবচেয়ে বড় অংশ ছিল ৪৮২ কোটি ৬৯ লাখ ৬৩ হাজার ৪২২ টাকার ডিমান্ড চার্জ।
  • ভ্যাট দেখানো হয়েছিল ২৪ কোটি ১৩ লাখ ৪৮ হাজার ১৭১ টাকা।
  • সংশোধনের পর প্রকৃত বিল দাঁড়ায় ১ হাজার ৯৬৩ টাকা।
  • পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ ভুলের কারণ হিসেবে তথ্য পোস্টিং বা টাইপিংয়ের ভুলের কথা জানিয়েছে।
  • ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
  • ৩০ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে জেনারেল ম্যানেজারকে বরখাস্ত করার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।

৫০৬ কোটি টাকার বিল, কিন্তু বিদ্যুৎ খরচ ২৩৫ ইউনিট

মাগুরার এই ঘটনা মূলত বিদ্যুৎ বিল তৈরির সময় তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব সামনে এনেছে। একজন আবাসিক গ্রাহকের জন্য ২৩৫ ইউনিট ব্যবহারের বিপরীতে কয়েকশ কোটি টাকার বিল তৈরি হওয়া একটি স্পষ্ট অস্বাভাবিকতা। পরে কর্তৃপক্ষ বিষয়টি শনাক্ত করে বিল সংশোধন করলেও ঘটনাটি নিয়ে দায়িত্বশীলতা ও যাচাই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তবে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গ্রাহককে শেষ পর্যন্ত ৫০৬ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়নি। ভুল শনাক্ত হওয়ার পর বিল সংশোধন করে ১ হাজার ৯৬৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সংশোধিত বিলই পরিশোধ করা হয়েছে। 

মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্তের কথা জানানো হয়েছে। পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং তদন্তের ফলাফলের মাধ্যমে বিলটি কীভাবে তৈরি হয়েছিল এবং কোন পর্যায়ে যাচাই ব্যর্থ হয়েছে, সে বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানা যেতে পারে।

সারসংক্ষেপ

মাগুরায় ২৩৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিপরীতে ৫০৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকার বিল আসার ঘটনাটি সত্য। তবে ৫০৬ কোটি টাকা কোনোভাবেই গ্রাহকের প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিল ছিল না। মিটার পরিবর্তনের সময় সিল নম্বরের ডিজিট ভুল করে ডিমান্ড চার্জের ঘরে পোস্ট হওয়ায় এই অস্বাভাবিক অঙ্ক তৈরি হয়েছিল বলে মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। পরে বিল সংশোধন করে প্রকৃত পরিমাণ ১ হাজার ৯৬৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়। 

প্রতিবেদন: মানচিত্র ডেস্ক

Avatar

মানচিত্র

Administrator of News Mancitro

Reader Comments (0)

No comments yet. Be the first to share your opinion!