আজ ২৬ সেপ্টেম্বর। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সমাজসংস্কারের ইতিহাসে দিনটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৮২০ সালের এই দিনে জন্মগ্রহণ করেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি একই সঙ্গে লেখক, শিক্ষাবিদ, সংস্কৃত পণ্ডিত ও সমাজসংস্কারক হিসেবে কাজ করেছেন।
মেদিনীপুরের বীরসিংহ গ্রামে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি পরবর্তী সময়ে বাংলা ভাষার গদ্যরীতি, শিক্ষাব্যবস্থা এবং নারীর সামাজিক অবস্থান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। তাঁর প্রচেষ্টার সঙ্গে ১৮৫৬ সালের বিধবা বিবাহ আইন পাসের ইতিহাসও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ভারত সরকারের প্রকাশিত তথ্যেও তাঁকে লেখক, শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারক এবং বাংলার নবজাগরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিদ্যাসাগর সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- পুরো নাম: ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
- জন্ম: ২৬ সেপ্টেম্বর ১৮২০
- জন্মস্থান: বীরসিংহ, মেদিনীপুর
- মৃত্যু: ২৯ জুলাই ১৮৯১
- পরিচিতি: লেখক, শিক্ষাবিদ, সংস্কৃত পণ্ডিত ও সমাজসংস্কারক
- বিখ্যাত গ্রন্থ: বর্ণপরিচয়
- উপাধি: বিদ্যাসাগর
বীরসিংহ থেকে কলকাতা
ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম মেদিনীপুরের বীরসিংহ গ্রামে। তাঁর বাবা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মা ভগবতী দেবী। শৈশব থেকেই পড়াশোনার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। পরবর্তী সময়ে তিনি কলকাতার সংস্কৃত কলেজে পড়াশোনা করেন এবং সংস্কৃত ও দর্শনসহ বিভিন্ন বিষয়ে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন।
তাঁর অসাধারণ পাণ্ডিত্যের কারণে সংস্কৃত কলেজ থেকেই তিনি ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি লাভ করেন। সংস্কৃত ভাষায় ‘বিদ্যা’ অর্থ জ্ঞান এবং ‘সাগর’ অর্থ সমুদ্র। অর্থাৎ ‘বিদ্যাসাগর’ বলতে জ্ঞানের সমুদ্র বোঝানো হয়। 2
বাংলা গদ্যের পরিবর্তনে বড় ভূমিকা
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সবচেয়ে আলোচিত অবদানগুলোর একটি বাংলা গদ্যের বিকাশ। তাঁর আগে বাংলা গদ্যে সংস্কৃতনির্ভর জটিল ভাষার ব্যবহার ছিল উল্লেখযোগ্য। বিদ্যাসাগর ভাষাকে আরও সুসংগঠিত, যুক্তিপূর্ণ ও পাঠযোগ্য করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তাঁর লেখা পাঠ্যবই ও অন্যান্য রচনার মাধ্যমে একটি পরিমিত ও সুসংগঠিত গদ্যরীতি জনপ্রিয় হয়। বিভিন্ন সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক সূত্রে তাঁকে আধুনিক বাংলা গদ্যের বিকাশের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 3
‘বর্ণপরিচয়’ বদলে দিয়েছিল প্রাথমিক শিক্ষার ভাষা
বাংলা ভাষা শেখার ক্ষেত্রে ‘বর্ণপরিচয়’ একটি ঐতিহাসিক গ্রন্থ। শিশুদের বাংলা বর্ণমালা ও প্রাথমিক ভাষাশিক্ষার জন্য বিদ্যাসাগর এই বই তৈরি করেন। বইটির মাধ্যমে বর্ণ শেখানোর পদ্ধতিকে সহজ ও সুসংগঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
ভারত সরকারের প্রকাশিত বিদ্যাসাগর-সংক্রান্ত তথ্যে তাঁর ‘বর্ণপরিচয়’কে বাংলা শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক গ্রন্থ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলা বর্ণমালা ও টাইপের সরলীকরণেও তাঁর ভূমিকার কথা সরকারি সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। 4
নারীশিক্ষার প্রসারে কাজ
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সমাজসংস্কারমূলক কাজের একটি বড় ক্ষেত্র ছিল নারীশিক্ষা। তিনি মনে করতেন সমাজের উন্নতির জন্য মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। স্কুল পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি বাংলার বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষার প্রসারে তাঁর উদ্যোগের কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক নথিতে পাওয়া যায়। 5
নারীদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা উনিশ শতকের সমাজে সহজ বিষয় ছিল না। সে সময় সামাজিক ও ধর্মীয় নানা বাধা ছিল। এসব বাধার মধ্যেও বিদ্যাসাগর মেয়েদের শিক্ষার পক্ষে কাজ করেন।
বিধবা বিবাহের পক্ষে আন্দোলন
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় বিধবা বিবাহ আন্দোলনের সঙ্গে। উনিশ শতকের বাংলায় বিধবা নারীদের সামাজিক জীবন নানা বিধিনিষেধে আবদ্ধ ছিল। বিদ্যাসাগর শাস্ত্রের বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও যুক্তি ব্যবহার করে বিধবা বিবাহের পক্ষে জনমত তৈরির চেষ্টা করেন।
তাঁর প্রচেষ্টার ফলে বিধবা বিবাহের বৈধতার পক্ষে আইন প্রণয়নের পথ তৈরি হয়। ১৮৫৬ সালে Hindu Widows' Remarriage Act বা হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন পাস হয়। ভারত সরকারের তথ্য অনুযায়ী, বিধবা পুনর্বিবাহ বৈধ করার আন্দোলনে বিদ্যাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। 6
বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধেও অবস্থান
বিদ্যাসাগরের সমাজসংস্কারের ক্ষেত্র শুধু বিধবা বিবাহে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক সমস্যার বিরুদ্ধেও যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। তাঁর বিভিন্ন লেখায় এসব সামাজিক প্রথার সমালোচনা এবং সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকাশনায় বিদ্যাসাগরের সামাজিক সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্যে বিধবা বিবাহ, নারীশিক্ষা এবং বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। 7
শুধু লেখক নন, ছিলেন শিক্ষকও
বিদ্যাসাগরের পরিচয় শুধু সাহিত্যিক হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি শিক্ষকতা ও শিক্ষা প্রশাসনের সঙ্গেও দীর্ঘ সময় যুক্ত ছিলেন। সংস্কৃত কলেজে তিনি অধ্যাপনা ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীতে শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে কাজ করেন।
শিক্ষার প্রসারে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তুলনামূলকভাবে বাস্তবমুখী। সাধারণ মানুষের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার জন্য সহজ ভাষায় পাঠ্যবই তৈরির প্রয়োজনীয়তাকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
বাংলা বই ও পাঠ্যসাহিত্যে তাঁর অবদান
বিদ্যাসাগর বিভিন্ন পাঠ্যবই ও অনুবাদধর্মী রচনা লিখেছেন। তাঁর রচনার একটি বড় অংশ ছিল শিক্ষামূলক। এসব বইয়ের ভাষা ও উপস্থাপনা পরবর্তী প্রজন্মের বাংলা ভাষাশিক্ষায় প্রভাব ফেলে।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিদ্যাসাগর একাডেমির গ্রন্থাগারের তালিকাতেও ‘বর্ণপরিচয়’সহ তাঁর একাধিক রচনার নাম সংরক্ষিত রয়েছে। 8
কেন ‘বিদ্যাসাগর’ নামটি এত পরিচিত?
ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল পরিচয়ের সঙ্গে পরে ‘বিদ্যাসাগর’ নামটি এতটাই যুক্ত হয়ে যায় যে তাঁর আসল নামের চেয়ে এই উপাধিই মানুষের কাছে বেশি পরিচিত হয়ে ওঠে। সংস্কৃত শিক্ষায় তাঁর অসাধারণ সাফল্য ও পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি হিসেবে এই উপাধি দেওয়া হয়েছিল।
তাঁর জ্ঞান, শিক্ষা ও সমাজসংস্কারের কাজের কারণে পরবর্তী সময়ে ‘বিদ্যাসাগর’ নামটি বাংলার ইতিহাসে একটি বিশেষ মর্যাদা লাভ করে।
মৃত্যুর পরও কেন তাঁর প্রভাব এত দীর্ঘস্থায়ী?
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর কাজের প্রভাব বাংলা ভাষা, শিক্ষা ও সমাজচিন্তায় দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে। তাঁর লেখা বই এখনও বাংলা ভাষাশিক্ষার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।
নারীশিক্ষা ও বিধবা বিবাহের মতো বিষয়ে তাঁর আন্দোলনও উনিশ শতকের সমাজসংস্কারের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিদ্যাসাগর একদিকে ভাষাকে সহজ ও সুসংগঠিত করার চেষ্টা করেছেন, অন্যদিকে সামাজিক রীতিনীতি নিয়ে যুক্তিনির্ভর বিতর্ক তৈরি করেছেন।
আজকের দিনে বিদ্যাসাগরকে কেন মনে করা হয়?
২৬ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মদিনে বিদ্যাসাগরকে স্মরণ করার অন্যতম কারণ হলো তাঁর বহুমুখী অবদান। তিনি একই সঙ্গে বাংলা ভাষার শিক্ষক, লেখক, শিক্ষাবিদ এবং সমাজসংস্কারক ছিলেন। ফলে তাঁর জীবনকে শুধু সাহিত্য বা শুধু সমাজসংস্কারের একটি ক্ষেত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন।
বাংলা গদ্যের বিকাশ, প্রাথমিক শিক্ষার বই, নারীশিক্ষা এবং বিধবা বিবাহের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর কাজ উনিশ শতকের বাংলার পরিবর্তনশীল সমাজের সঙ্গে যুক্ত।
বিদ্যাসাগরের ১০টি উল্লেখযোগ্য অবদান
- বাংলা গদ্যের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
- ‘বর্ণপরিচয়’ রচনা
- বাংলা ভাষার বর্ণমালা ও মুদ্রণরীতির সরলীকরণে ভূমিকা
- প্রাথমিক শিক্ষার জন্য পাঠ্যবই রচনা
- নারীশিক্ষার প্রসারে কাজ
- বিধবা বিবাহের পক্ষে আন্দোলন
- ১৮৫৬ সালের বিধবা পুনর্বিবাহ আইন প্রণয়নের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
- বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে অবস্থান
- বহুবিবাহের সমালোচনা
- শিক্ষাব্যবস্থার প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠান গঠনে অবদান
একজন সাহিত্যিকের চেয়ে বড় পরিসরের মানুষ
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে শুধু একজন সাহিত্যিক হিসেবে দেখলে তাঁর কাজের একটি অংশই সামনে আসে। তাঁর সাহিত্যিক ও ভাষাগত অবদান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি শিক্ষা এবং সমাজসংস্কারের ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল বিস্তৃত।
আজ তাঁর জন্মদিনে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি শিক্ষা ও সমাজসংস্কারের ইতিহাসেও তাঁর অবদান নতুন করে আলোচনায় আসছে। ১৮২০ সালের বীরসিংহের সেই শিশুটি পরবর্তীতে বাংলা সমাজের পরিবর্তনের ইতিহাসে স্থায়ী একটি নাম হয়ে ওঠেন।
আজ ২৬ সেপ্টেম্বর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মবার্ষিকী। বাংলা ভাষা, শিক্ষা ও সমাজসংস্কারের ইতিহাসে তাঁর অবদান তাই শুধু অতীতের একটি অধ্যায় নয়, বাংলা সমাজের আধুনিকতার ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তথ্যসূত্র: ভারত সরকারের Press Information Bureau, ভারত সরকারের শিক্ষা ও সংস্কৃতি সংক্রান্ত প্রকাশনা, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের Vidyasagar Academy এবং সরকারি শিক্ষা পোর্টালে প্রকাশিত তথ্য।

