বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের নতুন অধ্যায়
বিকাশ, রবি, বাংলালিংক-স্কয়ারসহ পাঁচ উদ্যোগ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনের প্রাথমিক অনুমোদন পেয়েছে। তবে এখনো এগুলো চূড়ান্ত ব্যাংকিং লাইসেন্স পায়নি।
বিকাশ-রবিসহ ৫ ডিজিটাল ব্যাংকের অনুমোদন, বদলে যাবে বাংলাদেশের ব্যাংকিং?
ঢাকা, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬: বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংকিং চালুর প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়েছে। বিকাশ, রবি, বাংলালিংক ও স্কয়ার গ্রুপসহ পাঁচ উদ্যোগকে প্রস্তাবিত ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনের জন্য প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ২৪ সেপ্টেম্বরের সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চারটি নতুন আবেদনকারী এবং একটি আগে থেকেই প্রাথমিক অনুমোদন পাওয়া প্রতিষ্ঠান। প্রাথমিক অনুমোদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে চূড়ান্ত লাইসেন্সের জন্য এগোতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চূড়ান্ত লাইসেন্স পাওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবকাঠামোসহ নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হবে।
যে ৫ উদ্যোগ প্রাথমিক অনুমোদন পেয়েছে
- DK Digital Bank - ভুটানের DK Bank-এর উদ্যোগ
- bKash Digital Bank - বিকাশের উদ্যোগ
- Nova Digital Bank - VEON ও Square Group-এর উদ্যোগ
- Boost Digital Bank - Robi Axiata-এর উদ্যোগ
- Kori Digital Bank - আগে প্রাথমিক অনুমোদন পাওয়া উদ্যোগ
প্রাথমিক অনুমোদন মানেই কি ব্যাংক চালু?
না। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া অনুমোদন এখনো চূড়ান্ত ব্যাংকিং লাইসেন্স নয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রথমে Letter of Intent বা LoI-এর শর্ত পূরণ করতে হবে। এরপর প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও অন্যান্য শর্ত পূরণ হলে তারা পূর্ণাঙ্গ লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারবে।
অর্থাৎ, এখনই গ্রাহকরা এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা পাবেন না। চূড়ান্ত লাইসেন্স এবং কার্যক্রম শুরুর জন্য পরবর্তী ধাপগুলো সম্পন্ন করতে হবে।
ডিজিটাল ব্যাংক কী?
ডিজিটাল ব্যাংক এমন একটি ব্যাংকিং ব্যবস্থা যেখানে গ্রাহকরা মূলত ওয়েবসাইট বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করবেন। প্রচলিত ব্যাংকের মতো শাখা, উপশাখা বা নিজস্ব এটিএম নেটওয়ার্কের ওপর এর কার্যক্রম নির্ভর করবে না।
বাংলাদেশের ডিজিটাল ব্যাংকিং নীতিমালা অনুযায়ী, ডিজিটাল ব্যাংকের মূল কার্যক্রম প্রযুক্তিনির্ভর হবে এবং গ্রাহকদের বড় অংশের সেবা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
গ্রাহকদের কী সুবিধা হতে পারে?
ডিজিটাল ব্যাংক চালু হলে ব্যাংকিং সেবার একটি বড় অংশ মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরিচালনা করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব মানুষ প্রচলিত ব্যাংকের শাখা থেকে দূরে থাকেন, তাদের জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ব্যাংকিং সেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে।
ডিজিটাল ব্যাংকের মাধ্যমে হিসাব খোলা, অর্থ স্থানান্তর, বিভিন্ন ধরনের পেমেন্ট এবং অন্যান্য ব্যাংকিং সেবা প্রযুক্তিনির্ভরভাবে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কোন প্রতিষ্ঠান কী কী সেবা দেবে, তা চূড়ান্ত লাইসেন্স ও সংশ্লিষ্ট নীতিমালার ওপর নির্ভর করবে।
শাখা থাকবে না, তাহলে টাকা তুলবেন কোথা থেকে?
ডিজিটাল ব্যাংকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নিজস্ব প্রচলিত শাখা নেটওয়ার্ক না থাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী ডিজিটাল ব্যাংকগুলো নিজস্ব শাখা, উপশাখা, এটিএম বা ক্যাশ ডিপোজিট মেশিন পরিচালনা করতে পারবে না।
তবে অন্যান্য ব্যাংকের এটিএম এবং এজেন্ট ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে গ্রাহকদের নির্দিষ্ট সেবা দেওয়ার সুযোগ থাকবে। ফলে গ্রাহকের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা মূলত অ্যাপ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকেন্দ্রিক হবে।
প্রচলিত ব্যাংক বনাম ডিজিটাল ব্যাংক
- শাখা: ডিজিটাল ব্যাংকের নিজস্ব প্রচলিত শাখা থাকবে না
- অ্যাপ: মোবাইল অ্যাপ হবে গুরুত্বপূর্ণ সেবা মাধ্যম
- এটিএম: নিজস্ব এটিএম নেটওয়ার্ক না রেখে অন্য ব্যাংকের নেটওয়ার্ক ব্যবহারের সুযোগ থাকবে
- লেনদেন: অনলাইন ও প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেনে গুরুত্ব
- সেবা: ছোট ঋণসহ নির্দিষ্ট ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার সুযোগ থাকবে
ডিজিটাল ব্যাংকের মূলধন কত?
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিজিটাল ব্যাংকিং নীতিমালায় প্রতিটি ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধনের শর্ত রয়েছে। বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী, একটি ডিজিটাল ব্যাংকের ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ৩০০ কোটি টাকা।
এ ধরনের মূলধন কাঠামোর উদ্দেশ্য হলো ডিজিটাল ব্যাংকিং কার্যক্রমে পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা এবং গ্রাহকদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ব্যাংকিং কাঠামো তৈরি করা।
বিকাশ ও টেলিকম কোম্পানির প্রবেশ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
প্রস্তাবিত ডিজিটাল ব্যাংকগুলোর মধ্যে কয়েকটির সঙ্গে মোবাইল আর্থিক সেবা ও টেলিকম খাতের বড় প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে ডিজিটাল লেনদেনের সঙ্গে আগে থেকেই পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তি ও গ্রাহকভিত্তিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ পেতে পারে।
বিশেষ করে bKash Digital Bank এবং Robi-সমর্থিত Boost Digital Bank-এর অনুমোদন বাংলাদেশের ডিজিটাল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস খাতে নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে। একইভাবে VEON ও Square Group-এর Nova Digital Bank প্রযুক্তি ও করপোরেট অবকাঠামোর সমন্বয়ে নতুন ধরনের ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য কী পরিবর্তন আসতে পারে?
বাংলাদেশ ব্যাংক ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কথা বলেছে। বিশেষ করে ছোট উদ্যোক্তা এবং ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর কাছে সহজে আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে বাস্তবে এই সুবিধা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সেবার মূল্য, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, গ্রাহক নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল ব্যাংকগুলোর ব্যবসায়িক মডেলের ওপর।
বড় শিল্পে ঋণ দেওয়ার সীমাবদ্ধতা
ডিজিটাল ব্যাংকগুলোকে প্রচলিত ব্যাংকের মতো সব ধরনের ঋণ দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। নীতিমালা অনুযায়ী, ডিজিটাল ব্যাংক বড় ও মাঝারি শিল্পের জন্য Letter of Credit বা বড় ধরনের ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। তাদের ঋণ কার্যক্রমের একটি অংশ ছোট আকারের ঋণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
এর ফলে ডিজিটাল ব্যাংকগুলোর সম্ভাব্য গ্রাহক হিসেবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ছোট ব্যবসা এবং ডিজিটাল আর্থিক সেবার ব্যবহারকারীরা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন।
বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংকের যাত্রা কেন এত দীর্ঘ হলো?
বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংক চালুর আলোচনা কয়েক বছর ধরে চলছে। প্রথম দফায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আবেদন করার পর নীতিমালা ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ এগোয়। পরবর্তীতে দ্বিতীয় দফায় নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো আবেদন করে।
সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়েছে। তবে প্রাথমিক অনুমোদন থেকে পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু পর্যন্ত আরও কয়েকটি regulatory ধাপ অতিক্রম করতে হবে।
এখন কী হবে?
- বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাথমিক অনুমোদনের শর্ত পূরণ
- প্রয়োজনীয় ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরি
- বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত অন্যান্য শর্ত পূরণ
- চূড়ান্ত লাইসেন্সের জন্য আবেদন
- লাইসেন্স পাওয়ার পর ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু
নগদ লেনদেন কমানোর পথে নতুন পদক্ষেপ
বাংলাদেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, QR পেমেন্ট এবং অনলাইন ব্যাংকিং দ্রুত বিস্তৃত হওয়ার পর ডিজিটাল ব্যাংকিং এই পরিবর্তনের পরবর্তী ধাপ হতে পারে। নতুন ব্যাংকগুলো কার্যক্রম শুরু করলে গ্রাহকদের সামনে ব্যাংকিং সেবা গ্রহণের আরও একটি মাধ্যম তৈরি হবে।
তবে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের বিস্তারের সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা, গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষা, প্রতারণা প্রতিরোধ এবং প্রযুক্তিগত স্থিতিশীলতার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
চূড়ান্ত লাইসেন্সের অপেক্ষায় পাঁচ প্রতিষ্ঠান
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের ফলে দেশে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের কাঠামো গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে গেল। তবে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানই এখনো পূর্ণাঙ্গ ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করার অনুমতি পায়নি। চূড়ান্ত লাইসেন্স পাওয়ার আগে তাদের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে হবে।
চূড়ান্ত অনুমোদন ও কার্যক্রম শুরুর পরই বোঝা যাবে বাংলাদেশের গ্রাহকদের জন্য ডিজিটাল ব্যাংকিং কতটা কার্যকর ও জনপ্রিয় হয়।
এক নজরে
- প্রাথমিক অনুমোদন: ৫টি ডিজিটাল ব্যাংক উদ্যোগ
- অনুমোদনকারী: বাংলাদেশ ব্যাংক
- প্রধান নাম: bKash, Boost, Nova, DK Digital Bank ও Kori
- ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন: ৩০০ কোটি টাকা
- নিজস্ব শাখা: থাকবে না
- নিজস্ব এটিএম: থাকবে না
- চূড়ান্ত লাইসেন্স: এখনো দেওয়া হয়নি
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের প্রবেশ নতুন প্রতিযোগিতা ও নতুন সেবা মডেলের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, গ্রাহক আস্থা, সেবার মান এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামো কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় তার ওপর।
প্রাথমিক অনুমোদন পাওয়া পাঁচ প্রতিষ্ঠান এখন চূড়ান্ত লাইসেন্স পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেবে। এরপর বাংলাদেশে ডিজিটাল ব্যাংকের প্রকৃত কার্যক্রম শুরু হলে গ্রাহকদের দৈনন্দিন ব্যাংকিং অভিজ্ঞতায় কী ধরনের পরিবর্তন আসে, সেটিই হবে দেখার বিষয়।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক, bdnews24.com, The Daily Star, The Business Standard এবং প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন।

