রংপুরের চার খুন: সিদ্ধার্থের বাবা-ভাইকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দিল ডিবি
হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন তথ্যের সন্ধান; কয়েক ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর বাড়ি ফিরলেন বিনয় দাস ও পার্থ দাস
রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়া এলাকায় একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের বাবা ও বড় ভাইকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। শনিবার বিকেলে তাঁদের বাড়ি থেকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। প্রায় চার ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর রাতে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তাঁদের কাছ থেকে নতুন কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়নি।
ডিবির এই তৎপরতা এসেছে রংপুরে চাঞ্চল্য তৈরি করা চার হত্যাকাণ্ডের তদন্তের মধ্যেই। নিহতরা হলেন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ১২ বছর বয়সী ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী। পুলিশ জানিয়েছে, চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছিল।
ঘটনার সর্বশেষ অবস্থা
- নিহত: একই পরিবারের চার সদস্য
- স্থান: মাছুয়াপাড়া, রংপুর নগর
- গ্রেপ্তার: মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস
- নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদ: সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস ও ভাই পার্থ দাস
- জিজ্ঞাসাবাদের পর: দুজনকেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে
- তদন্ত: ডিবি, পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে
বিকেলে বাড়ি থেকে ডিবি কার্যালয়ে
শনিবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে রংপুর মহানগর ডিবি পুলিশের একটি দল মাছুয়াপাড়ায় যায়। সেখান থেকে সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাস এবং তাঁর বড় ভাই পার্থ দাসকে গাড়িতে করে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চার হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তাঁদের কাছে কিছু তথ্য জানার প্রয়োজন ছিল। এর আগে তাঁদের কয়েকবার ডিবি কার্যালয়ে আসতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা সেখানে উপস্থিত না হওয়ায় পুলিশ শেষ পর্যন্ত তাঁদের নিজ বাড়ি থেকে নিয়ে যায়।
দীর্ঘ সময় ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তদন্তের জন্য নতুন কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে ডিবি। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাঁদের বাড়িতে ফেরত পাঠানো হয়।
পুলিশের অবস্থান
ডিবির বক্তব্য অনুযায়ী, সিদ্ধার্থের বাবা ও ভাইকে তদন্তের প্রয়োজনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে নতুন কোনো অভিযোগ বা গ্রেপ্তারের তথ্য দেওয়া হয়নি। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে দুজনকেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
কীভাবে সামনে আসে চার হত্যার ঘটনা?
রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়া এলাকায় একটি বাড়ি থেকে একই পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাটি সামনে আসে। নিহতদের মধ্যে ছিলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী। তাঁর সঙ্গে একই বাড়িতে থাকতেন স্ত্রী, মেয়ে ও অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে।
পরিবারটির সঙ্গে কয়েক দিন যোগাযোগ না থাকায় স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বাড়ির ভেতর থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে। ঘটনাটি ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যার তথ্য পাওয়া যায়। এরপর হত্যার কারণ এবং ঘটনায় কারা জড়িত—তা খুঁজতে তদন্ত শুরু হয়।
গ্রেপ্তার হন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ
হত্যাকাণ্ডের পর একই এলাকার দুই তরুণ মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং পরবর্তী তদন্তে হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন দিক সামনে আসে।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁরা নিহত পরিবারের বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনের উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন। সেখানে গণপতি চক্রবর্তী বিষয়টি দেখে ফেলায় পরিস্থিতি সংঘর্ষের দিকে যায় এবং পরে হত্যাকাণ্ড ঘটে বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন।
তবে হত্যাকাণ্ডের পুরো ঘটনা, প্রত্যেক অভিযুক্তের ভূমিকা এবং ঘটনার ধারাবাহিকতা আদালতের বিচারপ্রক্রিয়া ও তদন্তের মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হওয়ার বিষয়।
তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ মোড়
প্রথমে হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকলেও গ্রেপ্তার দুই তরুণের আদালতে দেওয়া জবানবন্দির পর তদন্তে একটি নির্দিষ্ট দিক সামনে আসে। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁদের বক্তব্য যাচাই করতে ডিএনএ পরীক্ষা ও ডোপ টেস্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি
গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে আদালতে হাজির করার পর তাঁদের বক্তব্য রেকর্ড করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তাঁরা হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। এরপর আদালতের নির্দেশে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়।
তবে আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হলেও তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় অন্যান্য আলামত, সাক্ষ্য ও ফরেনসিক তথ্যের সঙ্গে সেটিও যাচাই করা হবে।
সিদ্ধার্থের বাবা ও ভাইকে কেন জিজ্ঞাসাবাদ?
সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাস এবং বড় ভাই পার্থ দাস একই এলাকার বাসিন্দা। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সিদ্ধার্থ গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেও ঘটনার আগে ও পরে তাঁর চলাফেরা, যোগাযোগ এবং অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে তথ্য নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়।
ডিবি কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, তদন্তকারীরা তাঁদের আগেও কার্যালয়ে আসতে বলেছিলেন। পরে শনিবার তাঁদের বাড়ি থেকে নিয়ে গিয়ে দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
তবে জিজ্ঞাসাবাদ করা মানেই কোনো ব্যক্তি মামলার আসামি—এমন নয়। এই দুই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাও সেটিই নির্দেশ করে। তাঁদের বিরুদ্ধে নতুন কোনো অভিযোগ আনার কথা পুলিশ জানায়নি।
একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি
ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া এবং জিজ্ঞাসাবাদ করা মানেই গ্রেপ্তার বা মামলায় অভিযুক্ত হওয়া নয়। বিনয় দাস ও পার্থ দাসকে জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ ছেড়ে দিয়েছে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে নতুন কোনো অপরাধের অভিযোগের তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
চার হত্যার ঘটনায় তদন্ত কোথায়?
ঘটনাটির তদন্ত এখন একাধিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে। কেন ওই পরিবারকে লক্ষ্য করা হয়েছিল, হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে অভিযুক্তদের গতিবিধি কী ছিল, হত্যার সময় কারা উপস্থিত ছিল এবং ঘটনাস্থলে পাওয়া আলামতগুলো কী বলছে—এসব বিষয় তদন্তকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এরই মধ্যে পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযুক্তদের বক্তব্য যাচাইয়ের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত ও ফরেনসিক প্রমাণও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ এবং ডোপ টেস্টের আবেদন সেই তদন্তেরই অংশ। এসব পরীক্ষার ফল পাওয়া গেলে অভিযুক্তদের বক্তব্যের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের মিল-অমিলও যাচাই করা সম্ভব হবে।
নিহত পরিবারটি ছিল এলাকায় পরিচিত
গণপতি চক্রবর্তী দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন। অবসর নেওয়ার পর তিনি চিকিৎসাসেবার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। পরিবার নিয়ে মাছুয়াপাড়া এলাকায় বসবাস করতেন তিনি।
তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ছোট ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর মৃত্যু স্থানীয় মানুষের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে পরিবারের ১২ বছর বয়সী সন্তানের মৃত্যু ঘটনাটিকে আরও মর্মান্তিক করে তুলেছে।
তদন্তের পরবর্তী ধাপ
- গ্রেপ্তার দুই তরুণের বক্তব্য যাচাই
- ডিএনএ পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণ
- ডোপ টেস্টের ফল পর্যালোচনা
- ঘটনাস্থলের ফরেনসিক আলামত পরীক্ষা
- সাক্ষীদের বক্তব্য যাচাই
- হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ ঘটনার ধারাবাহিকতা নির্ধারণ
সাংবাদিকদের কাজেও বাধার অভিযোগ
হত্যাকাণ্ডের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে ঘটনাস্থলে সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া এক সাংবাদিককে হেনস্তার অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিদ্ধার্থের বড় ভাই পার্থ দাসের বিরুদ্ধে ওই অভিযোগ করা হয়েছে। ঘটনার প্রতিবাদে সাংবাদিকেরা ঘটনাস্থলের সামনে মৌন প্রতিবাদ কর্মসূচিও পালন করেন।
তবে এই অভিযোগের বিষয়টি চার হত্যাকাণ্ডের তদন্ত থেকে আলাদা। সাংবাদিকের সঙ্গে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত বা আইনি পদক্ষেপের তথ্য সামনে এলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।
তদন্তের স্বচ্ছতাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
একই পরিবারের চারজন হত্যার মতো ঘটনায় জনমনে স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। গ্রেপ্তার দুই তরুণের বক্তব্যের পাশাপাশি ঘটনাস্থলের আলামত, ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক পরীক্ষা এবং প্রত্যক্ষ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য—সবকিছুর সমন্বিত বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞ তদন্তের মাধ্যমে যদি প্রত্যেক অভিযুক্তের ভূমিকা, হত্যার উদ্দেশ্য এবং ঘটনার পূর্ণ ধারাবাহিকতা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা যায়, তাহলে মামলার বিচারিক প্রক্রিয়াও শক্ত ভিত্তি পাবে।
এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে
রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় একই পরিবারের চারজন হত্যার ঘটনায় দুই তরুণ গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। তাঁদের একজন সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাস ও বড় ভাই পার্থ দাসকে শনিবার তদন্তের প্রয়োজনে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কয়েক ঘণ্টা পর তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ বলছে, জিজ্ঞাসাবাদে নতুন কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে মূল মামলার তদন্তে ডিএনএ পরীক্ষা, ডোপ টেস্টসহ বিভিন্ন আলামত যাচাইয়ের প্রক্রিয়া চলছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিনয় দাস ও পার্থ দাসের বিরুদ্ধে এই মামলায় নতুন কোনো গ্রেপ্তার বা অভিযোগের তথ্য নেই। তদন্ত চলমান থাকায় পরবর্তী সময়ে নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে।

