নেপালের ভয়াবহ হিমবাহ ধসে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, বলছে নতুন গবেষণা

Avatar
মানচিত্র
17 Sep, 2026• 4 min read1 Views
নেপালের ভয়াবহ হিমবাহ ধসে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, বলছে নতুন গবেষণা

নেপালের ভয়াবহ হিমবাহ ধসে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, বলছে নতুন গবেষণা

২৬ আগস্টের বিপর্যয়ে ১,৩০০-এর বেশি মৃত্যু, নিখোঁজ ৫ হাজারেরও বেশি


আন্তর্জাতিক ডেস্ক: নেপালের উত্তরাঞ্চলে গত ২৬ আগস্ট ভয়াবহ রক-আইস অ্যাভালাঞ্চ ও পরবর্তী আকস্মিক বন্যার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষণাটি বলছে, হিমালয়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, হিমবাহের দ্রুত ক্ষয় এবং পারমাফ্রস্ট বা দীর্ঘদিন জমে থাকা বরফমাটির গলে যাওয়া পাহাড়ের ঢালকে ধীরে ধীরে দুর্বল করেছে।

World Weather Attribution-এর নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের একটি দল এই বিপর্যয়ের বিভিন্ন কারণ বিশ্লেষণ করেছে। গবেষকদের মতে, ঘটনাটি কোনো একক চরম আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে ঘটেনি। ভূতাত্ত্বিক দুর্বলতা, অতীতের ভূমিকম্প, হিমবাহের পরিবর্তন এবং উষ্ণায়নের মতো একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে।

বিপর্যয়ের বড় তথ্য

  • তারিখ: ২৬ আগস্ট ২০২৬
  • স্থান: নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চল
  • মৃত্যু: ১,৩০০-এর বেশি
  • নিখোঁজ: ৫,০০০-এর বেশি
  • মূল ঘটনা: পাহাড়ের বিশাল অংশ ও হিমবাহের বরফ ধসে পড়ে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি

কীভাবে ঘটল বিপর্যয়

গবেষণা অনুযায়ী, নেপালের লাংটাং লিরুং পর্বতের প্রায় ৫,১৫০ মিটার উচ্চতা থেকে বিশাল পরিমাণ পাথর ও বরফ ধসে পড়ে। প্রায় দুই বর্গকিলোমিটার এলাকার পাহাড়ি অংশের এই ধস নিচের উপত্যকার দিকে দ্রুতগতিতে নেমে আসে।

পাথর, বরফ ও ধ্বংসাবশেষের এই প্রবাহ পরে ব্যাপক পানিপ্রবাহে পরিণত হয়। প্রবল স্রোত নদীপথ ধরে নিচের জনবসতি, সড়ক, সেতু, সীমান্ত স্থাপনা এবং অন্যান্য অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি করে।

গবেষকদের হিসাবে, ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ গড়ে ঘণ্টায় প্রায় ১৮৮ কিলোমিটার গতিতে এগিয়ে যায়। এত দ্রুতগতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষের জন্য প্রচলিত আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেনি।

উষ্ণায়নের সঙ্গে সম্পর্ক কোথায়

World Weather Attribution-এর গবেষণায় বলা হয়েছে, হিমালয়ে দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে হিমবাহ পাতলা হয়ে যাচ্ছে এবং বরফে আবদ্ধ পাহাড়ি শিলার বিভিন্ন অংশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়ায় পাহাড়ের ফাটলের মধ্যে থাকা বরফের বন্ধনও দুর্বল হচ্ছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, হিমালয়ের ওই অঞ্চলে শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার সীমা সাম্প্রতিক দশকগুলোতে প্রতি দশকে প্রায় ১০০ মিটার করে ওপরের দিকে সরে গেছে। এর ফলে উচ্চতার আরও বেশি এলাকায় বরফ গলন ও পারমাফ্রস্ট ক্ষয়ের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: বিজ্ঞানীরা বলেননি যে জলবায়ু পরিবর্তন একাই ২৬ আগস্টের পাহাড়ধস ঘটিয়েছে। বরং দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণতা পাহাড়ের স্থিতিশীলতা কমিয়ে বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

২০১৫ সালের ভূমিকম্পের প্রভাবও বিবেচনায়

গবেষণায় ২০১৫ সালের ৭ দশমিক ৮ মাত্রার নেপাল ভূমিকম্পের সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনা করা হয়েছে। ওই ভূমিকম্প হিমালয়ের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছিল এবং দীর্ঘমেয়াদে কিছু পাহাড়ি ঢালকে দুর্বল করে থাকতে পারে বলে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন।

তবে ২০২৬ সালের ধসের ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের ভূমিকম্প ঠিক কতটা ভূমিকা রেখেছিল, তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। গবেষকদের মতে, ভূতাত্ত্বিক দুর্বলতা এবং জলবায়ু-সম্পর্কিত পরিবর্তন একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পাহাড়ের স্থিতিশীলতা কমিয়ে থাকতে পারে।

আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা

নেপালে বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু গবেষকদের মতে, ২৬ আগস্টের ঘটনা ছিল অত্যন্ত দ্রুতগতির এবং জটিল একটি দুর্যোগ। ফলে বিদ্যমান সতর্কতা ব্যবস্থার পক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোকে পর্যাপ্ত সময় আগে সতর্ক করা সম্ভব হয়নি।

গবেষণায় হিমালয়ের উচ্চভূমিতে আরও শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, ভূ-ঝুঁকি শনাক্তকরণ, তথ্য আদান-প্রদান এবং সীমান্তবর্তী দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।

এখনও চলছে উদ্ধার ও শনাক্তকরণ

বিপর্যয়ের কয়েক সপ্তাহ পরও নেপালে উদ্ধার ও নিখোঁজদের সন্ধান কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। রয়টার্সের ১৬ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে নেপালের জাতীয় দুর্যোগ কর্তৃপক্ষের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, প্রায় ৫,২০০ মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন এবং অন্তত ১,৩৯৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে।

উদ্ধার হওয়া মৃতদেহের একটি বড় অংশ এখনও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। কর্তৃপক্ষ ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যদের নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা করছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, হিমালয়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে হিমবাহ, পারমাফ্রস্ট এবং পাহাড়ি ঢালের ওপর এর প্রভাব আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে দ্রুতগতির ও একাধিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার সমন্বয়ে তৈরি দুর্যোগ মোকাবিলায় নতুন ধরনের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হতে পারে।

প্রতিবেদন: মানচিত্র ডেস্ক
Avatar

মানচিত্র

Administrator of News Mancitro

Reader Comments (0)

No comments yet. Be the first to share your opinion!