ভিসার মেয়াদ শেষ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার ব্রিটিশ ডানপন্থী মিলো ইয়ান্নোপোলাস
ইমিগ্রেশন শুনানিতে অনুপস্থিতির পর অপসারণের চূড়ান্ত আদেশ; নিউ অরলিন্স বিমানবন্দর থেকে আটকের একদিন পর যুক্তরাজ্যে পাঠানো হলো
যুক্তরাষ্ট্র থেকে যুক্তরাজ্যে বহিষ্কার করা হয়েছে ব্রিটিশ ডানপন্থী রাজনৈতিক ভাষ্যকার মিলো ইয়ান্নোপোলাসকে। দেশটির অভিবাসন কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করলেও অনুমোদিত সময়ের পরও দেশটিতে অবস্থান করছিলেন। পরে একটি অভিবাসন শুনানিতে হাজির না হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অপসারণ আদেশ জারি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE) গত বৃহস্পতিবার লুইজিয়ানার নিউ অরলিন্স আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৪১ বছর বয়সী ইয়ান্নোপোলাসকে আটক করে। পরদিন তাঁকে যুক্তরাজ্যে পাঠানো হয় বলে মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (DHS) জানিয়েছে।
ঘটনার মূল তথ্য
- আটক: নিউ অরলিন্স আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর
- আটককারী সংস্থা: ICE
- যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ: মে ২০১৯
- অপসারণের আদেশ: ২২ জুলাই ২০২৬
- বহিষ্কার: যুক্তরাজ্যে
- বয়স: ৪১ বছর
কেন বহিষ্কার করা হলো ইয়ান্নোপোলাসকে?
মার্কিন কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইয়ান্নোপোলাস ২০১৯ সালের মে মাসে নিউইয়র্ক দিয়ে বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন। তবে তাঁর অনুমোদিত অবস্থানের সময়সীমা শেষ হওয়ার পরও তিনি দেশটিতে থেকে যান।
পরবর্তীতে তাঁর জন্য নির্ধারিত অভিবাসন শুনানিতে তিনি উপস্থিত হননি। এরপর একজন অভিবাসন বিচারক ২২ জুলাই তাঁর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অপসারণ আদেশ জারি করেন। সেই আদেশের ভিত্তিতেই ICE তাঁকে আটক করে এবং যুক্তরাজ্যে পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।
DHS-এর বক্তব্য
মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ জানিয়েছে, ইয়ান্নোপোলাস অনুমোদিত সময়ের বেশি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেছিলেন এবং অভিবাসন আইনের আওতায় তাঁর বিরুদ্ধে অপসারণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিমানবন্দর থেকেই আটক
নিউ অরলিন্সের লুই আর্মস্ট্রং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাতায়াতের সময় ইয়ান্নোপোলাসকে আটক করা হয়। তাঁর নিউ অরলিন্সে অবস্থানের কারণ নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি সংগীতশিল্পী ইয়ের একটি অনুষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন।
ইয়ে—যিনি আগে কানিয়ে ওয়েস্ট নামে পরিচিত ছিলেন—নিউ অরলিন্সে একটি অনুষ্ঠান করেছিলেন। ইয়ান্নোপোলাসের সঙ্গে এই সংগীতশিল্পীর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও পেশাগত যোগাযোগ রয়েছে।
অভিবাসনবিরোধী অবস্থানের কারণে ঘটনাটি আলোচিত
ইয়ান্নোপোলাসের বহিষ্কারের ঘটনা রাজনৈতিকভাবে বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছে তাঁর অতীতের বক্তব্যের কারণে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করার পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছিলেন। এমনকি অবৈধ অভিবাসীদের দ্রুত শনাক্ত ও বহিষ্কারের জন্য আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছিলেন।
তাঁর এমন অবস্থানের কারণে এবার নিজেই মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হাতে আটক ও বহিষ্কৃত হওয়ায় ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রাজনৈতিকভাবে যে কারণে ব্যতিক্রমী
ইয়ান্নোপোলাস দীর্ঘদিন ধরে কঠোর অভিবাসন নীতির সমর্থক হিসেবে পরিচিত। তাই নিজের অভিবাসন-সংক্রান্ত অনিয়মের কারণে ICE-এর হাতে আটক হয়ে বহিষ্কৃত হওয়ার ঘটনা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে একটি উল্লেখযোগ্য বৈপরীত্য তৈরি করেছে।
ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক কী ছিল?
২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ডোনাল্ড ট্রাম্পের অন্যতম সোচ্চার সমর্থক ছিলেন ইয়ান্নোপোলাস। সে সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী রাজনৈতিক পরিসরে বেশ পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে অভিবাসন, ইসলাম, নারীবাদ এবং সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর বিতর্কিত বক্তব্য তাঁকে আলোচনায় রাখত।
তবে সময়ের সঙ্গে ট্রাম্প ও বৃহত্তর মার্কিন রক্ষণশীল রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের পরিবর্তন হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু নীতির সমালোচনাও করেছেন।
Breitbart-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন
ইয়ান্নোপোলাস একসময় মার্কিন রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যম Breitbart News-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেখানে কাজ করার সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী ও অল্ট-রাইট রাজনৈতিক পরিসরে ব্যাপক পরিচিতি পান।
তবে তাঁর বেশ কিছু বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে ২০১৭ সালে তাঁর প্রভাব দ্রুত কমতে থাকে। Breitbart থেকে সরে দাঁড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও প্রকাশনা-সংক্রান্ত সুযোগও হারান তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিতর্কিত ইতিহাস
ইয়ান্নোপোলাসের অনলাইন কর্মকাণ্ডও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। ২০১৬ সালে অভিনেত্রী ও কৌতুকশিল্পী লেসলি জোন্সকে লক্ষ্য করে তাঁর করা আক্রমণাত্মক পোস্টের পর তৎকালীন Twitter তাঁকে নিষিদ্ধ করেছিল। পরে প্ল্যাটফর্মটি ইলন মাস্কের মালিকানায় যাওয়ার পর তাঁর অ্যাকাউন্ট পুনর্বহাল করা হয়।
২০১৭ সালে কিশোরদের নিয়ে তাঁর কিছু মন্তব্যও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। সেই বিতর্কের পর তাঁর পেশাগত অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে এবং তিনি মূলধারার রক্ষণশীল রাজনীতি থেকে অনেকটাই দূরে সরে যান।
ইয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইয়ান্নোপোলাসের নাম যুক্ত হয়েছে ইয়ে বা কানিয়ে ওয়েস্টের সঙ্গে। তিনি ওয়েস্টের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং ২০২৪ সালের ওয়েস্টের রাজনৈতিক প্রচেষ্টার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
এর আগে ২০২২ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইয়ে এবং শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী নিক ফুয়েন্টেসকে ঘিরে একটি বিতর্কিত বৈঠক আয়োজনের সঙ্গেও তাঁর নাম উঠে আসে। বিষয়টি তখন মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি করেছিল।
নিউ অরলিন্সে কেন ছিলেন?
ইয়ান্নোপোলাসের সাম্প্রতিক নিউ অরলিন্স সফরের সঙ্গে ইয়ের একটি নির্ধারিত অনুষ্ঠানের যোগসূত্র থাকার কথা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। তবে ঠিক কী কাজে তিনি সেখানে ছিলেন, সে বিষয়ে তাঁর পক্ষ থেকে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
লরা লুমারের সঙ্গে পুরোনো দ্বন্দ্ব
ইয়ান্নোপোলাসের বহিষ্কারের পর ডানপন্থী কর্মী লরা লুমারের প্রতিক্রিয়াও আলোচনায় এসেছে। দুজনের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রকাশ্য বিরোধ রয়েছে।
লুমার দাবি করেছেন, তিনি ইয়ান্নোপোলাসের অভিবাসন-সংক্রান্ত অবস্থার বিষয়ে মার্কিন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছিলেন। তবে তাঁর দাবিই গ্রেপ্তার বা বহিষ্কারের সরাসরি কারণ ছিল—এমন কোনো স্বাধীন সরকারি নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
নিজের বক্তব্য এখনো প্রকাশ করেননি
বহিষ্কারের পর ইয়ান্নোপোলাসের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রমও আটকের পর উল্লেখযোগ্যভাবে নীরব রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
ফলে তাঁর বহিষ্কারের বিষয়ে এখন পর্যন্ত প্রধান তথ্যসূত্র হচ্ছে মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতিতে নতুন বার্তা?
ইয়ান্নোপোলাসের বহিষ্কারকে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান কঠোর অভিবাসন প্রয়োগনীতির একটি দৃশ্যমান উদাহরণ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। DHS ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদিত সময়ের বেশি অবস্থান করা বিদেশিদের স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের বার্তা হলো, অভিবাসন আইন ভঙ্গ করলে রাজনৈতিক পরিচয় বা জনপরিচিতি নির্বিশেষে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। ইয়ান্নোপোলাসের মতো রাজনৈতিকভাবে পরিচিত একজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে দ্রুত অপসারণ সেই বার্তাকে আরও দৃশ্যমান করেছে।
ঘটনার তাৎপর্য
- যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইন প্রয়োগে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত
- ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অবস্থানের ঝুঁকি স্পষ্ট
- অভিবাসন শুনানিতে উপস্থিত না হলে অপসারণের আদেশ হতে পারে
- রাজনৈতিক পরিচিতি থাকলেও অভিবাসন আইনের প্রয়োগ থেকে ছাড় নেই
এখন কী হবে?
যুক্তরাজ্যে ফেরত পাঠানোর পর ইয়ান্নোপোলাসের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও পেশাগত কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর পরবর্তী প্রবেশের সুযোগও অভিবাসন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ও প্রযোজ্য আইনের ওপর নির্ভর করবে।
অন্যদিকে ঘটনাটি মার্কিন অভিবাসন নীতির রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও উসকে দিতে পারে। বিশেষ করে যারা অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের কঠোর নীতির সমর্থক, তাঁদের মধ্যেও আইন প্রয়োগের ধরন নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শেষ কথা
যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে প্রবেশের প্রায় সাত বছর পর অভিবাসন আইনের কারণে দেশটি ছাড়তে হলো মিলো ইয়ান্নোপোলাসকে। নির্ধারিত শুনানিতে অনুপস্থিত থাকার পর তাঁর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অপসারণ আদেশ জারি হয়েছিল। নিউ অরলিন্স বিমানবন্দর থেকে ICE তাঁকে আটকের একদিন পর যুক্তরাজ্যে পাঠায়। কঠোর অভিবাসন নীতির সমর্থক হিসেবে তাঁর অতীত অবস্থানের কারণে ঘটনাটি ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সংক্ষেপে: ব্রিটিশ ডানপন্থী ভাষ্যকার মিলো ইয়ান্নোপোলাসকে ভিসার মেয়াদ অতিক্রম ও অভিবাসন শুনানিতে অনুপস্থিতির পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে যুক্তরাজ্যে বহিষ্কার করা হয়েছে।

