দুইবার পিছিয়েও হারেনি লিভারপুল, মুনিয়োজের গোলে নটিংহ্যামের সঙ্গে ২-২ ড্র
আলেকসান্দার ইসাকের পর ভিক্টর মুনিয়োজের দুর্দান্ত গোল; নতুন মৌসুমে টানা দ্বিতীয় ড্র লিভারপুলের
দুইবার পিছিয়ে পড়েও ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচে সমতা ফিরিয়েছে লিভারপুল। তবে শেষ পর্যন্ত জয়ের দেখা পায়নি তারা। শনিবার অ্যানফিল্ডে নটিংহ্যাম ফরেস্টের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করেছে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দলটি।
নটিংহ্যামের হয়ে গোল করেছেন ড্যান এনদোয়ে ও মরগান গিবস-হোয়াইট। লিভারপুলের হয়ে আলেকসান্দার ইসাক প্রথমবার সমতা ফেরানোর পর ৮২ মিনিটে দুর্দান্ত শটে দ্বিতীয় গোলটি করেন ভিক্টর মুনিয়োজ। ফলে ম্যাচের শেষদিকে হার এড়াতে সক্ষম হয় স্বাগতিকরা।
ম্যাচের ফল এক নজরে
- লিভারপুল ২-২ নটিংহ্যাম ফরেস্ট
- ২৪ মিনিট: ড্যান এনদোয়ে — নটিংহ্যাম
- ৬০ মিনিট: আলেকসান্দার ইসাক — লিভারপুল
- ৭০ মিনিট: মরগান গিবস-হোয়াইট, পেনাল্টি — নটিংহ্যাম
- ৮২ মিনিট: ভিক্টর মুনিয়োজ — লিভারপুল
- ভেন্যু: অ্যানফিল্ড
শুরুতেই আক্রমণাত্মক ফরেস্ট
অ্যানফিল্ডে ম্যাচের শুরুতে বলের দখল ও আক্রমণে লিভারপুল এগিয়ে থাকলেও নটিংহ্যাম ফরেস্ট দ্রুত পাল্টা আক্রমণের মাধ্যমে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। স্বাগতিক রক্ষণভাগকে বেশ কয়েকবার পরীক্ষায় ফেলেন ফরেস্টের আক্রমণভাগের খেলোয়াড়েরা।
লিভারপুলেরও গোলের সুযোগ ছিল। সপ্তম মিনিটে আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের পাস থেকে কোডি গাকপো সুযোগ তৈরি করলেও নিকো উইলিয়ামসের সময়োপযোগী ট্যাকলে তা নষ্ট হয়। এরপর ফরেস্টও কয়েকটি আক্রমণ থেকে গোলের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
২৪ মিনিটে এগিয়ে যায় নটিংহ্যাম
ম্যাচের ২৪ মিনিটে লিভারপুলের রক্ষণভাগের ভুলের সুযোগ নিয়ে প্রথম গোলটি করে ফরেস্ট। গোলরক্ষক ম্যাট সেলসের লম্বা বল ঠিকভাবে সামলাতে পারেনি লিভারপুলের রক্ষণ। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইগর জেসুস বল নামিয়ে দেন। এরপর মরগান গিবস-হোয়াইটের পাস থেকে ড্যান এনদোয়ে ঠান্ডা মাথায় বল জালে পাঠান।
গোল হজম করার পর দ্রুত ম্যাচে ফিরতে মরিয়া হয়ে ওঠে লিভারপুল। ৩২ মিনিটে ফ্লোরিয়ান ভির্টৎস বল জালে পাঠালেও অফসাইডের কারণে সেটি বাতিল হয়। এরপর ভির্টৎসের আরেকটি হেডও ঠেকিয়ে দেন ফরেস্ট গোলরক্ষক।
বিরতির আগে বড় সুযোগ ফরেস্টের
প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে ইগর জেসুসের শক্তিশালী শট অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকান লিভারপুল গোলরক্ষক আলিসন। বলটি বারে লেগে বাইরে চলে যায়। সেই মুহূর্তে গোল হলে বিরতির আগেই ফরেস্টের ব্যবধান দুই গোলে পৌঁছে যেতে পারত।
বিরতিতে ১-০ গোলে এগিয়ে ছিল নটিংহ্যাম ফরেস্ট। প্রথম ৪৫ মিনিটে লিভারপুল বলের নিয়ন্ত্রণ রাখলেও আক্রমণের শেষ ধাপে কাঙ্ক্ষিত ধার দেখাতে পারেনি।
ইসাকের গোলে স্বস্তি লিভারপুলের
দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে ফিরে লিভারপুলের আক্রমণের গতি বাড়ে। একের পর এক আক্রমণে ফরেস্টের রক্ষণকে চাপে ফেলে স্বাগতিকরা। শেষ পর্যন্ত ৬০ মিনিটে আসে কাঙ্ক্ষিত সমতাসূচক গোল।
ফ্লোরিয়ান ভির্টৎসের পাস ধরে বাঁ দিক দিয়ে উঠে কোডি গাকপো নিচু ক্রস বাড়ান। সঠিক জায়গায় থাকা আলেকসান্দার ইসাক কাছ থেকে সহজ টোকায় বল জালে পাঠান। ১-১ গোলে ম্যাচে ফিরে আসে লিভারপুল।
ইসাকের গোলের গুরুত্ব
প্রথমার্ধে খুব বেশি সুযোগ না পাওয়া ইসাক দ্বিতীয়ার্ধে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গোল করে দলকে ম্যাচে ফেরান। লিভারপুলের আক্রমণভাগে নতুন এই সংযোজনের কাছ থেকে গোল পাওয়াটা ছিল দলের জন্য ইতিবাচক দিক।
আবারও পিছিয়ে পড়ে লিভারপুল
সমতা ফেরানোর পর লিভারপুলের ওপর কিছুটা স্বস্তি নেমে এলেও সেটি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ৬৮ মিনিটে দ্রুত থ্রো-ইনের পর নিকো উইলিয়ামস বক্সের ভেতরে ঢুকে পড়েন। তাঁকে আটকাতে গিয়ে আলিসন ফাউল করেছেন বলে সিদ্ধান্ত দেন রেফারি। ফলে পেনাল্টি পায় ফরেস্ট।
৭০ মিনিটে স্পটকিক থেকে গোল করেন মরগান গিবস-হোয়াইট। আলিসনকে ভুল দিকে পাঠিয়ে বল জালে পাঠিয়ে নটিংহ্যামকে আবারও এগিয়ে দেন তিনি। স্কোর তখন ২-১।
পেনাল্টির সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক থাকলেও ফরেস্ট সুযোগটি কাজে লাগাতে ভুল করেনি। ম্যাচের শেষ ২০ মিনিটে লিভারপুলকে আবারও সমতা ফেরানোর কঠিন পরীক্ষায় পড়তে হয়।
মুনিয়োজের দুর্দান্ত গোলে বাঁচল লিভারপুল
লিভারপুলের জার্সিতে ঘরের মাঠে নিজের অভিষেক স্মরণীয় করে রাখলেন ভিক্টর মুনিয়োজ। ৮২ মিনিটে ফ্লোরিয়ান ভির্টৎসের পাস পেয়ে বক্সের কাছাকাছি বল নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। এরপর প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারের চাপের মধ্যেই ঘুরে দাঁড়িয়ে ডান পায়ের শক্তিশালী শট নেন।
শটটি ক্রসবারের নিচে লেগে জালে ঢুকে যায়। গোলরক্ষক ম্যাট সেলসের কিছুই করার ছিল না। মুহূর্তেই ২-২ সমতা ফিরে আসে অ্যানফিল্ডে।
৮২ মিনিটের মুহূর্ত
ভিক্টর মুনিয়োজের দুর্দান্ত শটেই দুইবার পিছিয়ে থেকেও ম্যাচে ফিরে আসে লিভারপুল।
শেষ মুহূর্তে জয়ের চেষ্টা
সমতা ফেরানোর পর লিভারপুলের সামনে সুযোগ আসে ম্যাচটি জিতে নেওয়ার। যোগ করা সময়সহ শেষ কয়েক মিনিটে ফরেস্টের ওপর চাপ তৈরি করে তারা। ডমিনিক সোবোসলাই ফ্রি-কিক থেকেও গোলের কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। কিন্তু তাঁর শট অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
শেষ পর্যন্ত আর কোনো গোল না হওয়ায় ২-২ স্কোরলাইনেই শেষ হয় ম্যাচ। দুই দলই এক পয়েন্ট করে নিয়ে মাঠ ছাড়ে।
ইরাওলার প্রথম জয়ের অপেক্ষা বাড়ল
লিভারপুলের নতুন কোচ আন্দোনি ইরাওলার অধীনে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে প্রথম জয় এখনও অধরা। মৌসুমের প্রথম ম্যাচেও লিভারপুল দুইবার পিছিয়ে গিয়ে নিউক্যাসল ইউনাইটেডের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করেছিল। এবারও একই ব্যবধানে পিছিয়ে থেকে সমতা ফিরিয়ে আনল দলটি।
ফলে নতুন মৌসুমের প্রথম দুই লিগ ম্যাচেই লিভারপুলের সংগ্রহ দুই পয়েন্ট। দুটি ম্যাচেই চারটি করে গোল হয়েছে এবং দুবারই দলকে পিছিয়ে পড়ার পর ম্যাচে ফিরতে হয়েছে।
লিভারপুলের মৌসুম শুরুর চিত্র
- প্রথম ম্যাচ: নিউক্যাসলের সঙ্গে ২-২ ড্র
- দ্বিতীয় ম্যাচ: নটিংহ্যাম ফরেস্টের সঙ্গে ২-২ ড্র
- দুই ম্যাচে গোল: ৪
- দুই ম্যাচে হজম: ৪
- পয়েন্ট: ২
ফরেস্টও পেল মৌসুমের প্রথম পয়েন্ট
অন্যদিকে নটিংহ্যাম ফরেস্টের জন্য এই ড্রও গুরুত্বপূর্ণ। অ্যানফিল্ড থেকে এক পয়েন্ট নিয়ে ফিরেছে দলটি। তবে জয়ের সুযোগ তাদের হাতছাড়া হয়েছে বলেই মনে হতে পারে। কারণ ম্যাচে দুইবার লিড নিয়েও শেষ পর্যন্ত তা ধরে রাখতে পারেনি তারা।
ফরেস্টের আক্রমণভাগ বিশেষ করে প্রথমার্ধে লিভারপুলের রক্ষণকে যথেষ্ট চাপে রেখেছিল। গোলরক্ষক আলিসনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ না হলে স্বাগতিকদের বিপদ আরও বাড়তে পারত।
ম্যাচে লিভারপুলের সবচেয়ে বড় সমস্যা কোথায়?
দুই ম্যাচে চার গোল করেও লিভারপুলের ফলাফল জয়ে পরিণত হয়নি। এর পেছনে রক্ষণভাগের কিছু দুর্বলতা বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। নটিংহ্যামের প্রথম গোলটি আসে লম্বা বল সামলাতে গিয়ে রক্ষণভাগের ভুল থেকে। দ্বিতীয় গোলটি আসে পেনাল্টি থেকে।
আক্রমণভাগে গাকপো, ইসাক ও মুনিয়োজের ইতিবাচক মুহূর্ত থাকলেও ম্যাচের বড় সময়জুড়ে লিভারপুলকে প্রতিপক্ষের পাল্টা আক্রমণ সামলাতে হয়েছে। নতুন কোচের অধীনে দলটি এখনও নিজেদের কাঙ্ক্ষিত ভারসাম্য খুঁজছে বলেই ম্যাচের চিত্রে মনে হয়েছে।
মুনিয়োজের জন্য বিশেষ রাত
দলের জয় না এলেও ভিক্টর মুনিয়োজের পারফরম্যান্স আলাদা করে নজর কেড়েছে। অভিষেকেই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গোল করে তিনি লিভারপুলকে পরাজয়ের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। তাঁর গোলটি শুধু স্কোর সমতায় ফেরায়নি, বরং নতুন মৌসুমে দলের আক্রমণভাগে আরও একটি বিকল্পের সম্ভাবনাও দেখিয়েছে।
দুই দলের জন্যই সামনে কঠিন পরীক্ষা
প্রিমিয়ার লিগের মৌসুম মাত্র শুরু হয়েছে। তাই দুই ম্যাচের ফলাফল দিয়ে কোনো দলের সামগ্রিক শক্তি বা দুর্বলতার চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা কঠিন। তবে লিভারপুলের জন্য দ্রুত রক্ষণভাগের সমন্বয় বাড়ানো এবং ম্যাচে শুরু থেকেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে নটিংহ্যাম ফরেস্ট এই ম্যাচ থেকে আত্মবিশ্বাস পেতে পারে। অ্যানফিল্ডে লিভারপুলকে দুইবার পিছনে ফেলতে পারা দলটির আক্রমণাত্মক সক্ষমতার প্রমাণ। এখন সেই পারফরম্যান্সকে জয়ে রূপান্তর করাই তাদের পরবর্তী লক্ষ্য।
শেষ কথা
অ্যানফিল্ডে লিভারপুল আবারও হার থেকে বাঁচল, কিন্তু জয় পেল না। নটিংহ্যাম ফরেস্টের বিপক্ষে দুইবার পিছিয়ে পড়েও ইসাক ও মুনিয়োজের গোলে সমতা ফেরানোয় অন্তত এক পয়েন্ট নিশ্চিত হয়েছে। তবে টানা দুই ম্যাচে ২-২ ড্র ইরাওলার জন্য স্পষ্ট বার্তা—দলের আক্রমণে সম্ভাবনা থাকলেও রক্ষণে আরও স্থিরতা এবং পুরো ম্যাচে নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
ফলাফল: লিভারপুল ২-২ নটিংহ্যাম ফরেস্ট।

