কিয়েভের কাছে রুশ ড্রোন হামলায় গুদামে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত ৩৭
মাইলা এলাকায় অস্ত্র ও বিস্ফোরক মজুতের গুদামে হামলার পর আগুন; ক্ষতিগ্রস্ত অন্তত ৫০টি আবাসিক ভবন, সরিয়ে নেওয়া হয়েছে প্রায় ৪০০ মানুষ
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের পশ্চিমে মাইলা এলাকায় একটি গুদামে রাশিয়ার ড্রোন হামলার পর ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৩৭ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও কয়েক ডজন মানুষ। হামলার পর আগুন আশপাশের আবাসিক এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং অন্তত ৫০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রায় ৪০০ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার রাতের এই হামলাটি কিয়েভ অঞ্চলে রাশিয়ার ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অংশ ছিল। তবে গুদামে মজুত থাকা বিস্ফোরক বা গোলাবারুদে আগুন ধরে যাওয়ার পর একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটায় হতাহতের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যায়। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ এখন গুদামে বিস্ফোরক সামগ্রী রাখার বৈধতা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও তদন্ত শুরু করেছে।
হামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- স্থান: মাইলা, বুচা জেলা, কিয়েভ অঞ্চল
- হামলার সময়: শুক্রবার রাত
- নিহত: অন্তত ৩৭ জন
- আহত: ৪০ জনের বেশি; তাঁদের মধ্যে চার শিশু
- ক্ষতিগ্রস্ত: অন্তত ৫০টি আবাসিক ভবন
- উদ্ধার: প্রায় ৪০০ মানুষকে এলাকা থেকে সরানো হয়েছে
ড্রোন আঘাতের পরই শুরু হয় বিস্ফোরণ
কিয়েভের পশ্চিমে বুচা জেলার মাইলা গ্রামে অবস্থিত ওই স্থাপনায় রাতের আকাশে ড্রোন হামলার পরপরই বড় ধরনের আগুন দেখা যায়। এরপর গুদামের ভেতরে থাকা বিস্ফোরক সামগ্রীতে একের পর এক বিস্ফোরণ শুরু হয়। বিস্ফোরণের তীব্রতায় আশপাশের বাড়িঘর ও অন্যান্য স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্থানীয় কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগুন দ্রুত আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। উদ্ধারকাজ চালানোর সময়ও ঘটনাস্থলে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ফলে জরুরি সেবাকর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদেরও নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া হয়।
ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা নিয়ে উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
বিস্ফোরণে কেন এত ক্ষয়ক্ষতি?
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ড্রোনের আঘাতের পর গুদামে থাকা বিস্ফোরক বা গোলাবারুদে আগুন ধরে যায়। সেখান থেকেই ধারাবাহিক বিস্ফোরণ ঘটে এবং আগুন আশপাশের আবাসিক এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
আহত ৪০-এর বেশি, শিশুদেরও আঘাত
কিয়েভ অঞ্চলের কর্মকর্তাদের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, হামলায় অন্তত ৪২ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে চারজন শিশু রয়েছে। নিহতের সংখ্যা প্রথমে ২৭ বলে জানানো হলেও উদ্ধারকাজ এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে তা বেড়ে ৩৭-এ পৌঁছায়।
এ ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ের একজন জনপ্রতিনিধিও নিহত হয়েছেন। দিমিত্রিভকা সম্প্রদায়ের প্রধান তারাস দিদিচ হামলার পর উদ্ধার তৎপরতায় সহায়তা করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন বলে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
আবাসিক এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে আগুন
গুদামে বিস্ফোরণের পর আগুন শুধু ওই স্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আশপাশের বাড়িঘর এবং একটি রেস্তোরাঁও আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের হিসাবে অন্তত ৫০টি আবাসিক ভবন বিভিন্ন মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ঘটনার পর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে প্রায় ৪০০ মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের কারণে স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থাতেও সাময়িক বিঘ্ন ঘটে।
বেসামরিক এলাকায় হামলার প্রভাব
- আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত
- বাড়িঘরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে
- শত শত মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরানো হয়
- শিশুসহ বহু মানুষ আহত হন
- উদ্ধারকারীদের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়
গুদামে গোলাবারুদ রাখা হয়েছিল কি না, তদন্ত
হামলার পর শুধু রুশ হামলার বিষয়টিই নয়, ওই গুদামে বিস্ফোরক বা গোলাবারুদ কীভাবে রাখা হয়েছিল—সেটিও তদন্তের কেন্দ্রে এসেছে। ইউক্রেনীয় প্রসিকিউটররা সম্ভাব্য অবহেলার অভিযোগে ফৌজদারি তদন্ত শুরু করেছেন।
তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, সেখানে বিস্ফোরক সামগ্রী রাখা আইনসম্মত ছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় অনুমতি ও নিরাপত্তা ছাড়পত্র পেয়েছিল কি না। বিশেষ করে জনবসতিপূর্ণ এলাকার কাছে এ ধরনের সামগ্রী রাখার ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়েছিল কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও ঘটনাটির পর দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
যুদ্ধের মধ্যে সামরিক বা বিস্ফোরক সামগ্রী জনবসতির কাছাকাছি কেন রাখা হয়েছিল? হামলার পর এই প্রশ্নটি ইউক্রেনের ভেতরেও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ মিশন জানিয়েছে, ঘটনাটির পরিস্থিতি যাচাই করতে তারা তথ্য সংগ্রহ করছে।
এক রাতেই ২৬৭ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র
এই হামলা কেবল মাইলা এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল না। ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার গভীর রাত থেকে শনিবার ভোর পর্যন্ত রাশিয়া ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় ২৬৭টি ড্রোন ও দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।
ইউক্রেনীয় বিমানবাহিনী জানিয়েছে, বহু ড্রোন আকাশেই ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করা হয়। তবে কয়েকটি এলাকায় রুশ অস্ত্র সরাসরি আঘাত হানে এবং বিভিন্ন স্থানে ধ্বংসাবশেষ পড়ে।
কিয়েভের আশপাশে সাম্প্রতিক কয়েক দিনের ধারাবাহিক হামলার মধ্যে এই অভিযান বিশেষভাবে বড় ছিল। রাজধানী ও আশপাশের অঞ্চলে প্রায় টানা কয়েক রাত ধরে রুশ হামলা চলেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
কিয়েভের অন্য এলাকাতেও প্রাণহানি
মাইলা এলাকার ভয়াবহ বিস্ফোরণের পাশাপাশি কিয়েভ ও আশপাশের অন্যান্য এলাকায়ও রুশ হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে একটি হামলায় দুই বছরের একটি শিশু নিহত হয়েছে। রাজধানীর বাইরের একটি এলাকায় ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীরও মৃত্যু হয়েছে।
এতে বোঝা যায়, হামলার প্রভাব শুধু সামরিক স্থাপনা বা অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; সাধারণ মানুষের বসবাসের এলাকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাশিয়ার বক্তব্য কী?
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের বাহিনী মাইলা এলাকায় একটি অস্ত্রসংক্রান্ত স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। রুশ পক্ষের দাবি, সেখানে দূরপাল্লার ড্রোনের যন্ত্রাংশ ও সামরিক সরঞ্জাম ছিল।
অন্যদিকে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ বলছে, ওই স্থাপনায় গোলাবারুদ বা অন্যান্য বিস্ফোরক সামগ্রী থাকার কারণেই হামলার পর এত বড় বিস্ফোরণ ঘটে। ফলে স্থাপনাটিতে কী ধরনের সামগ্রী ছিল এবং সেগুলো সেখানে রাখা বৈধ ছিল কি না—তা এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
দুই পক্ষের বক্তব্য
রাশিয়া: হামলায় অস্ত্র ও দূরপাল্লার ড্রোন-সংক্রান্ত স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল বলে দাবি করেছে।
ইউক্রেন: হামলার পর বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক প্রাণহানি হয়েছে এবং গুদামে বিস্ফোরক সামগ্রী রাখার বৈধতা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে।
যুদ্ধের এ বছরের সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাগুলোর একটি
৩৭ জনের মৃত্যুর ফলে মাইলা এলাকার এই হামলাটি ২০২৬ সালে ইউক্রেনে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে উঠে এসেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। এর আগে জুলাইয়ে কিয়েভে একটি হামলায় ৩১ জন নিহত হওয়ার ঘটনা ছিল বছরের সবচেয়ে বড় প্রাণহানির ঘটনা।
এই হামলা ইউক্রেনের জন্য আরও একটি উদ্বেগের কারণ তৈরি করেছে—একদিকে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান ড্রোন হামলা, অন্যদিকে সামরিক সরঞ্জাম সংরক্ষণের নিরাপত্তা। যুদ্ধের পরিবেশে অস্ত্র ও গোলাবারুদ কোথায় এবং কীভাবে রাখা হচ্ছে, তা এখন বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেনের পাল্টাপাল্টি ড্রোন হামলা বাড়ছে
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই দূরপাল্লার ড্রোন হামলা বাড়িয়েছে। ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে রুশ হামলায় আবাসিক এলাকা, জ্বালানি অবকাঠামো, গুদাম ও পরিবহনকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সময়ে ইউক্রেনও রাশিয়ার সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালাচ্ছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ মিশন জানিয়েছে, ইউক্রেনে বেসামরিক হতাহতের পরিস্থিতি সাম্প্রতিক সময়ে আরও গুরুতর হয়েছে। জুলাই ২০২৬-এ দেশটিতে ২০২২ সালের মার্চের পর যেকোনো মাসের তুলনায় সবচেয়ে বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত ও আহত হওয়ার তথ্য যাচাই করেছে সংস্থাটি।
মাইলা হামলা থেকে যে প্রশ্নগুলো সামনে এলো
- গুদামে কী ধরনের বিস্ফোরক বা গোলাবারুদ রাখা হয়েছিল?
- জনবসতির কাছে সেগুলো রাখা আইনসম্মত ছিল কি না?
- স্থাপনাটির প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নিরাপত্তা ছাড়পত্র ছিল কি?
- হামলার আগে স্থানীয় বাসিন্দাদের কোনো ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল কি না?
- রুশ হামলার পাশাপাশি গুদাম ব্যবস্থাপনায় কোনো অবহেলা ছিল কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর ইউক্রেনীয় তদন্ত শেষ হওয়ার পরই স্পষ্ট হবে। জাতিসংঘও জানিয়েছে, তারা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, প্রত্যক্ষদর্শী ও অন্যান্য উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করছে এবং ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই করছে।
উদ্ধারকাজ চলছে, বাড়ছে উদ্বেগ
হামলার পর ধ্বংসস্তূপ ও ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোতে উদ্ধারকাজ অব্যাহত রয়েছে। বিপজ্জনক বিস্ফোরক পরিস্থিতির কারণে উদ্ধারকারীদেরও সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে। ফলে নিহতের সংখ্যা চূড়ান্ত কি না, তা নিয়েও এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
শেষ কথা
কিয়েভের কাছে মাইলা এলাকায় রুশ ড্রোন হামলা শুধু একটি সামরিক স্থাপনায় আঘাতের ঘটনা হয়ে থাকেনি; বিস্ফোরক মজুতের কারণে তা ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। অন্তত ৩৭ জনের মৃত্যু, বহু মানুষের আহত হওয়া এবং আবাসিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় যুদ্ধের ঝুঁকি আবারও সাধারণ মানুষের জীবনের ওপর কতটা গভীরভাবে পড়ছে, তা স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে গুদামে বিস্ফোরক রাখার বৈধতা ও নিরাপত্তা নিয়ে শুরু হওয়া তদন্তও এই ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
নোট: নিহত ও আহতের সংখ্যা চলমান উদ্ধারকাজের কারণে পরিবর্তিত হতে পারে। প্রতিবেদনে ২৯ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া ইউক্রেনীয় সরকারি ও আন্তর্জাতিক সংবাদসূত্রের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।

