বৃষ্টিতে ভেস্তে গেল লর্ডসের দিন, পাকিস্তানকে ৩৫৭ রানের লক্ষ্য দিয়ে জয়ের পথে ইংল্যান্ড
ড্যান লরেন্সের অপরাজিত ফিফটি, আব্বাসের দুর্দান্ত বোলিং; মাত্র ২৪.৫ ওভারেই থামল তৃতীয় দিনের খেলা
বৃষ্টি ও খারাপ আলোর কারণে লর্ডসে ইংল্যান্ড-পাকিস্তান দ্বিতীয় টেস্টের তৃতীয় দিনের বেশির ভাগ সময়ই খেলা হয়নি। তবে অল্প সময়ের খেলাতেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তভাবে নিজেদের হাতে নিয়েছে ইংল্যান্ড। দিন শেষে দ্বিতীয় ইনিংসে ৭ উইকেটে ১৭৭ রান করেছে স্বাগতিকরা। সব মিলিয়ে পাকিস্তানের চেয়ে তারা এগিয়ে আছে ৩৫৭ রানে।
দিনের সবচেয়ে উজ্জ্বল পারফরম্যান্স ছিল ড্যান লরেন্সের। কঠিন ব্যাটিং কন্ডিশনে ৬৬ বলে অপরাজিত ৫০ রান করেছেন তিনি। অন্যদিকে পাকিস্তানের হয়ে মোহাম্মদ আব্বাস আবারও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি উইকেট তুলে নিয়ে ইংল্যান্ডের ব্যাটিংয়ে চাপ তৈরি করেছেন।
তৃতীয় দিনের চিত্র এক নজরে
- ভেন্যু: লর্ডস, লন্ডন
- ইংল্যান্ড: ২৯০ ও ১৭৭/৭
- পাকিস্তান: ১১০
- ইংল্যান্ডের লিড: ৩৫৭ রান
- ড্যান লরেন্স: অপরাজিত ৫০
- মোহাম্মদ আব্বাস: দ্বিতীয় ইনিংসে ৩ উইকেট
- খেলা হয়েছে: মাত্র ২৪.৫ ওভার
সকালে মাঠেই নামতে পারেনি দুই দল
শনিবার লর্ডসের সকালটা শুরু হয়েছিল বৃষ্টির দাপটে। মাঠ ঢেকে রাখা হয়েছিল কভারে। কয়েক দফা বৃষ্টি থামলেও মাঠ খেলার উপযোগী করতে সময় লেগে যায়। ফলে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও খেলা শুরু করা সম্ভব হয়নি।
শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ অপেক্ষার পর স্থানীয় সময় দুপুরের পর মাঠে নামেন দুই দলের ক্রিকেটাররা। কিন্তু আবহাওয়ার উন্নতি ছিল সাময়িক। কিছুক্ষণ খেলা হওয়ার পর আবারও বৃষ্টি এসে বাধা দেয়। দিনের শেষেও খারাপ আলো পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলে।
আগের দিনের ৮১ রানে ৩ উইকেট নিয়ে শুরু
ইংল্যান্ড তৃতীয় দিনের খেলা শুরু করেছিল দ্বিতীয় ইনিংসে ৩ উইকেটে ৮১ রান নিয়ে। প্রথম ইনিংসে তারা করেছিল ২৯০ রান। জবাবে পাকিস্তানকে মাত্র ১১০ রানে অলআউট করে ইংল্যান্ড ১৮০ রানের বিশাল লিড পেয়েছিল।
ফলে দ্বিতীয় ইনিংসে খুব বড় স্কোর করার প্রয়োজন ছিল না। পাকিস্তানের সামনে এমন একটি লক্ষ্য দাঁড় করানোই ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্য ছিল, যা বাকি সময় ও আবহাওয়ার পরিস্থিতিতে তাড়া করা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়।
পাকিস্তানের জন্য বড় সমস্যা
প্রথম ইনিংসে পাকিস্তানের ব্যাটিং ভেঙে পড়ে মাত্র ১১০ রানে। ইংল্যান্ডের চার পেসারের আক্রমণের সামনে পাকিস্তানের ব্যাটাররা নিয়মিত উইকেট হারিয়েছেন। ফলে দ্বিতীয় ইনিংসে বড় রান তাড়া করার চাপ আরও বেড়েছে।
আবারও বল হাতে জ্বলে উঠলেন আব্বাস
লর্ডসের মেঘলা আবহাওয়া ও অসম বাউন্স পাকিস্তানের পেসারদের জন্য আদর্শ পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। সেই সুযোগ সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছেন মোহাম্মদ আব্বাস।
তৃতীয় দিনের শুরুতেই ইংল্যান্ডের ওপেনার এমিলিও গেকে ৩১ রানে ফিরিয়ে দেন তিনি। নিচু হয়ে আসা একটি বলে এলবিডব্লিউ হন গে। এরপর হ্যারি ব্রুক ও জেমি স্মিথকেও নিজের শিকার বানান আব্বাস।
ব্রুক ৩৪ রান করে মোহাম্মদ রিজওয়ানের হাতে ক্যাচ দেন। এরপর জেমি স্মিথ ৭ রান করে ফেরেন। দিনের দ্বিতীয় সেশনে ইংল্যান্ড দ্রুত কয়েকটি উইকেট হারালেও লরেন্সের ব্যাটিংয়ে দলটি বড় লিড ধরে রাখে।
আব্বাসের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন
মোহাম্মদ আব্বাস দ্বিতীয় ইনিংসে আরও ৩ উইকেট নিয়ে ম্যাচে তাঁর মোট শিকারকে বাড়িয়ে নিয়েছেন। লর্ডসের কন্ডিশনে তাঁর নিয়ন্ত্রিত লাইন-লেন্থ ইংল্যান্ডের ব্যাটারদের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছিল।
ব্রুকের ৩৪, স্মিথের ৭
এমিলিও গে আউট হওয়ার পর হ্যারি ব্রুক ও ড্যান লরেন্স কিছুটা সময় পরিস্থিতি সামাল দেন। দুজনের ব্যাটে আসে ৪৫ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি।
ব্রুক অবশ্য বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। ৩৪ রান করে আব্বাসের বলে উইকেটের পেছনে রিজওয়ানের হাতে ক্যাচ দেন তিনি। এরপর জেমি স্মিথও ৭ রান করে একই বোলারের শিকার হন।
ফলে ইংল্যান্ডের স্কোর ১৪৯ রানে পৌঁছানোর আগেই তাদের ছয়টি উইকেট পড়ে যায়। ম্যাচের এই পর্যায়ে পাকিস্তানের বোলাররা কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেলেও প্রথম ইনিংসের ১৮০ রানের ঘাটতি তাদের জন্য বড় বাধা হয়ে থাকে।
লরেন্সের ব্যাটে টিকে থাকল ইংল্যান্ড
একদিকে যখন একের পর এক উইকেট পড়ছিল, অন্যদিকে ড্যান লরেন্স ধৈর্য ধরে ব্যাট করে গেছেন। কঠিন আলো, মেঘলা আকাশ এবং অনিয়মিত বাউন্সের মধ্যেও তিনি নিজের শট নির্বাচনে নিয়ন্ত্রণ রাখেন।
শেষ পর্যন্ত ৬৬ বলে ফিফটি পূর্ণ করেন লরেন্স। তাঁর ইনিংসে ছিল চার ও ছয়ের মিশ্রণ। দিনের খেলা শেষ হওয়ার সময় তিনি ৫০ রানে অপরাজিত ছিলেন।
জাতীয় দলে ফেরার পর এটি তাঁর টানা দ্বিতীয় টেস্ট ফিফটি। নতুন-look ইংল্যান্ড দলে নিজের জায়গা শক্ত করার লড়াইয়ে এই ইনিংস তাঁর জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ড্যান লরেন্সের ইনিংস
৫০* রান | ৬৬ বল
কঠিন কন্ডিশনে ধৈর্য ধরে খেলে ইংল্যান্ডের লিডকে আরও বড় করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন লরেন্স।
অ্যাটকিনসনও ফিরলেন, এরপর বৃষ্টি
দিনের শেষ দিকে গাস অ্যাটকিনসন ৭ রান করে মোহাম্মদ আলীর বলে এলবিডব্লিউ হন। তখন ইংল্যান্ডের স্কোর ১৬২ রানে ৭ উইকেট। এরপর লরেন্স কিছুটা দ্রুত রান তুলে দলকে ১৭৭ পর্যন্ত নিয়ে যান।
শেষ পর্যন্ত ৪৬.৫ ওভারে ইংল্যান্ডের স্কোর দাঁড়ায় ১৭৭/৭। লরেন্স ৫০ এবং অলি রবিনসন ২ রানে অপরাজিত ছিলেন। এরপর আর মাঠে ফেরা সম্ভব হয়নি।
মাত্র ২৪.৫ ওভারেই শেষ দিনের খেলা
লর্ডসের তৃতীয় দিনে মোট খেলা হয়েছে মাত্র ২৪.৫ ওভার। সকালের পুরো সেশন বৃষ্টিতে নষ্ট হওয়ার পর বিকেলে কিছুটা খেলা হলেও বারবার বৃষ্টি ফিরে আসে। পরে আলো কমে যাওয়ায় দিনের খেলা শেষ করে দেন আম্পায়াররা।
প্রায় সাড়ে ছয়টার দিকে দিনের খেলা পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। এত কম ওভার খেলা হওয়ায় দর্শকদের হতাশাও ছিল স্পষ্ট।
আবহাওয়াই এখন ম্যাচের বড় প্রশ্ন
ইংল্যান্ড ম্যাচের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও লর্ডসের আবহাওয়া তাদের দ্রুত জয় নিশ্চিত করার পথে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা। বাকি দিনগুলোতে পর্যাপ্ত সময় পাওয়া গেলে ইংল্যান্ডের জয় অনেকটাই সম্ভাব্য হয়ে উঠবে।
পাকিস্তানের সামনে পাহাড়সম লক্ষ্য
ইংল্যান্ডের মোট লিড এখন ৩৫৭ রান। অর্থাৎ পাকিস্তানকে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামার পর জয়ের জন্য এই বিশাল লক্ষ্য পাড়ি দিতে হবে। টেস্ট ক্রিকেটে এমন লক্ষ্য তাড়া করা এমনিতেই কঠিন; তার ওপর লর্ডসের পিচে বলের অসম বাউন্স ও সিম মুভমেন্ট পাকিস্তানের কাজ আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
এর আগে এই সিরিজের প্রথম টেস্টেও পাকিস্তানের ব্যাটিং খুব বেশি প্রতিরোধ গড়তে পারেনি। লিডসে ইংল্যান্ড ইনিংস ব্যবধানে জয় পেয়েছিল। ফলে দ্বিতীয় টেস্টেও পাকিস্তান এখন সিরিজ বাঁচানোর কঠিন অবস্থানে রয়েছে।
ইংল্যান্ডের সামনে সিরিজ জয়ের সুযোগ
প্রথম টেস্টে জয়ের পর লর্ডস টেস্টেও ইংল্যান্ড জয়ের দ্বারপ্রান্তে। এই ম্যাচ জিততে পারলে সিরিজ ২-০ ব্যবধানে নিজেদের করে নেবে তারা।
বিশেষ করে প্রথম ইনিংসে পাকিস্তানকে মাত্র ১১০ রানে অলআউট করা ইংল্যান্ডের চার পেসারের পারফরম্যান্স ছিল ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনা। জোফরা আর্চার, অলি রবিনসন, জশ টাং এবং গাস অ্যাটকিনসনের পেস আক্রমণ পাকিস্তানের ব্যাটিংকে শুরু থেকেই চাপে রেখেছে।
ইংল্যান্ডের জয়ের সমীকরণ
- দ্বিতীয় ইনিংসে আরও কিছু রান যোগ করা
- পাকিস্তানের সামনে বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করা
- নতুন বল হাতে পেসারদের কাজে লাগানো
- আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে দ্রুত পাকিস্তানের ব্যাটিং ভেঙে দেওয়া
লর্ডসে পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ের বড় পরীক্ষা
পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ব্যাটিং। প্রথম ইনিংসে দলের মাত্র একজন ব্যাটার ৪০-এর বেশি রান করতে পেরেছেন। ইংল্যান্ডের পেসারদের বিপক্ষে টপ অর্ডার বারবার ব্যর্থ হয়েছে।
লর্ডসের পিচে যদি আবারও মেঘলা আবহাওয়া ও সিমিং কন্ডিশন থাকে, তাহলে পাকিস্তানের ব্যাটারদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে। বিপরীতে আবহাওয়া পরিষ্কার হলে রান করার সুযোগ কিছুটা বাড়তে পারে।
টানা দ্বিতীয় ফিফটি লরেন্সের
ড্যান লরেন্সের জন্য ম্যাচটি আলাদা গুরুত্ব বহন করছে। জাতীয় দলে ফেরার পর প্রথম টেস্টেও তিনি ফিফটি করেছিলেন। এবারও কঠিন পরিস্থিতিতে অর্ধশতক তুলে নিয়ে তিনি দেখালেন, টেস্ট ক্রিকেটে নিজের জায়গা ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ে তিনি প্রস্তুত।
নতুন ইংল্যান্ড দলে নিয়মিত জায়গা করে নেওয়ার জন্য ধারাবাহিক পারফরম্যান্স প্রয়োজন। লর্ডসে তাঁর অপরাজিত ৫০ সেই ধারাবাহিকতারই আরেকটি উদাহরণ হয়ে থাকল।
শেষ কথা
বৃষ্টি লর্ডস টেস্টের তৃতীয় দিনকে প্রায় কেড়ে নিলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ইংল্যান্ডের হাত থেকে কেড়ে নিতে পারেনি। ২৯০ রানের প্রথম ইনিংসের পর পাকিস্তানকে ১১০ রানে গুটিয়ে দিয়ে পাওয়া বড় লিডের সঙ্গে দ্বিতীয় ইনিংসে আরও ১৭৭ রান যোগ করেছে ইংল্যান্ড। ড্যান লরেন্সের অপরাজিত ফিফটি দলকে ৩৫৭ রানের এগিয়ে দিয়েছে। এখন ম্যাচের ভাগ্য অনেকটাই নির্ভর করছে আবহাওয়া ও পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ের ওপর।
স্কোর: ইংল্যান্ড ২৯০ ও ১৭৭/৭; পাকিস্তান ১১০। ইংল্যান্ড এগিয়ে ৩৫৭ রানে।
তথ্যসূত্র: Reuters, BBC Sport, The Guardian, Sky Sports এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট প্রতিবেদনের সমন্বিত তথ্য।

