গুমবিরোধী নতুন আইন নিয়ে প্রশ্ন, স্বজনদের দাবি স্বাধীন তদন্তের
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল–২০২৬ জাতীয় সংসদে উত্থাপনের পর এর কয়েকটি ধারা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন গুমের অভিযোগে নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজন ও মানবাধিকারকর্মীরা। তাঁদের মূল দাবি, গুমের অভিযোগের তদন্ত কোনো শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে না রেখে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালনা করতে হবে।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস সামনে রেখে শনিবার ঢাকায় আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এসব দাবি উঠে আসে। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ স্বজনদের পরিবারের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে নিখোঁজ হওয়া বাগেরহাটের মিরাজ শেখের পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
মূল বিষয়
গুমের অভিযোগের তদন্তে স্বাধীনতা, ভুক্তভোগী পরিবারের অধিকার এবং নতুন আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে মানবাধিকারকর্মীদের উদ্বেগই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
স্বজনদের অভিযোগ, এখনো অপেক্ষার শেষ নেই
অনুষ্ঠানে নিখোঁজ মিরাজ শেখের স্ত্রী মুক্তা খাতুন স্বামীর সন্ধান পাওয়ার আকুতি জানান। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১০ এপ্রিল বাগেরহাটের মোংলা এলাকার জয়মনি অঞ্চলে মিরাজকে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবারটির দাবি, তাঁকে কোস্টগার্ডের সদস্যরা নিয়ে গেছেন।
মিরাজের পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাঁকে নিয়ে যাওয়ার ঘটনার পর বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেও তাঁর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও স্বজনদের অনিশ্চয়তা কাটেনি।
মিরাজ শেখকে ঘিরে যে প্রশ্ন
- ১০ এপ্রিল থেকে তাঁর সন্ধান না পাওয়ার দাবি পরিবারের।
- পরিবারের অভিযোগ, তাঁকে কোস্টগার্ড সদস্যরা নিয়ে গিয়েছিলেন।
- কোস্টগার্ড এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
- সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, তদন্তে সরকারি বাহিনীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কোস্টগার্ডের বক্তব্য কী
মিরাজকে আটক বা নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড। বাহিনীটির বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ইউনিটের অপারেশনাল রেকর্ড, টহল কার্যক্রম ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের তথ্য যাচাই করা হয়েছে।
কোস্টগার্ড আরও জানিয়েছে, ১০ এপ্রিল জয়মনি এলাকায় তাদের কোনো বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়নি। মিরাজ নিখোঁজ হওয়ার পর করা সাধারণ ডায়েরিতেও কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে তাঁকে আটক, অপহরণ বা গুম করার অভিযোগ ছিল না বলে বাহিনীটি দাবি করেছে।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও বলেছেন, মিরাজের ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তে কোনো সরকারি বাহিনীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন হলে স্বাধীন তদন্তের সুযোগ রাখার কথাও তিনি জানিয়েছেন।
নতুন গুমবিরোধী বিল নিয়ে আপত্তি
২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করা হয়। বিলটিতে গুমকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে গুরুতর শাস্তির বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে। কোনো ভুক্তভোগী মারা গেলে বা দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকলে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে—এমন বিধানও বিলে রাখা হয়েছে।
তবে মানবাধিকারকর্মীদের একটি অংশের আপত্তি মূলত তদন্তব্যবস্থা নিয়ে। তাঁদের মতে, কোনো আইনশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্তের দায়িত্ব এমন কোনো বাহিনীকে দেওয়া উচিত নয়, যার সঙ্গে অভিযুক্ত বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক রয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীদের প্রধান দাবি
- স্বাধীন তদন্ত: গুমের অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন জাতীয় বা স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া।
- পরিবারের অধিকার: দীর্ঘদিন নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের আর্থিক ও সম্পত্তিগত অধিকার নিশ্চিত করা।
- আইনি হয়রানি বন্ধ: গুমের অভিযোগে ভুক্তভোগী বা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের হয়রানি না করা।
দীর্ঘদিন নিখোঁজদের পরিবারের কষ্টও সামনে
আলোচনায় ২০১৯ সাল থেকে নিখোঁজ ইসমাইল হোসেন বাতেনের মেয়ে আনিশা ইসলাম ইনশাও বক্তব্য দেন। তাঁর ভাষ্য, বছরের পর বছর পার হলেও বাবার কোনো সন্ধান পাননি তিনি। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে নিখোঁজের অভিযোগ ওঠায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে আরও কয়েকটি পরিবারের সদস্য তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তাঁদের বক্তব্যে বারবার উঠে আসে একই বিষয়—নিখোঁজ ব্যক্তির অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য না থাকায় পরিবারগুলো বছরের পর বছর অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে।
সরকারের অবস্থান ভিন্ন
মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগের বিপরীতে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমান সরকারের সময়ে গুমের ঘটনা ঘটেনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মিরাজ শেখের ঘটনাতেও সরকারি বাহিনীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, প্রয়োজন হলে বিষয়টি নিয়ে স্বাধীন তদন্ত করা যেতে পারে।
নতুন আইন নিয়েও সরকারের বক্তব্য হলো, গুমের মতো গুরুতর অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার জন্যই আইনটি করা হচ্ছে। বিলে অপরাধের ধরন অনুযায়ী কঠোর শাস্তির পাশাপাশি দীর্ঘদিন নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সম্পত্তিগত অধিকার এবং ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
বিতর্ক এখন তদন্তের স্বাধীনতা ঘিরে
ফলে নতুন আইনকে কেন্দ্র করে মূল বিতর্ক শুধু শাস্তির মাত্রা নিয়ে নয়; বরং অভিযোগের তদন্ত কে করবে এবং সেই তদন্ত কতটা স্বাধীন হবে—এ প্রশ্নটিই সামনে এসেছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বক্তব্য, গুমের মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তকারী সংস্থার ওপর ভুক্তভোগী ও অভিযুক্ত—দুই পক্ষেরই আস্থা থাকা প্রয়োজন। অন্যদিকে সরকার বলছে, প্রস্তাবিত আইনে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সংসদীয় পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে।
এক নজরে
- বিল: গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬
- সংসদে উত্থাপন: ২৭ আগস্ট ২০২৬
- মূল বিতর্ক: গুমের অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত
- ভুক্তভোগীদের দাবি: নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধান ও ন্যায়বিচার
- সরকারের অবস্থান: বর্তমান সরকারের সময়ে গুমের ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি
সত্য উদ্ঘাটনে স্বাধীন তদন্তের দাবি
মিরাজ শেখের ঘটনা থেকে শুরু করে দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকা ব্যক্তিদের বিষয়—সব ক্ষেত্রেই এখন স্বজনদের প্রধান প্রত্যাশা একটাই, তাঁরা যেন নির্ভরযোগ্য তথ্য পান। কেউ জীবিত থাকলে তাঁকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া এবং অপরাধের প্রমাণ মিললে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি রয়েছে তাঁদের।
নতুন আইন সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সময় তদন্তব্যবস্থা ও ভুক্তভোগী পরিবারের অধিকার নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠেছে, সেগুলোর সমাধান কতটা কার্যকরভাবে হয়—এখন সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কারণ গুমের অভিযোগের ক্ষেত্রে শুধু আইন থাকা যথেষ্ট নয়; সত্য উদ্ঘাটনের জন্য এমন একটি তদন্তব্যবস্থাও প্রয়োজন, যার ওপর ভুক্তভোগী ও সাধারণ মানুষের আস্থা তৈরি হয়।

