সিলিকনের বাইরে নতুন দিগন্ত, ডিএনএ দিয়ে তৈরি হলো কম্পিউটার
পানি, লবণ ও DNA অণু ব্যবহার করে যোগ, গুণ, ভাগসহ নানা হিসাব করতে সক্ষম নতুন মলিকিউলার কম্পিউটার
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক: কম্পিউটারের জগতে সিলিকননির্ভর প্রযুক্তির বাইরে নতুন এক সম্ভাবনার দরজা খুলেছেন আয়ারল্যান্ডের মেনুথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। তাঁরা DNA অণু ব্যবহার করে একটি নতুন ধরনের মলিকিউলার কম্পিউটার তৈরি করেছেন, যা পানি ও লবণের মধ্যে থাকা DNA অণুর পারস্পরিক ক্রিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন গাণিতিক হিসাব করতে পারে।
গবেষণাটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানবিষয়ক জার্নাল Nature-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের তৈরি ব্যবস্থাটি প্রচলিত কম্পিউটারের মতো সিলিকন চিপ ব্যবহার করে না। এর পরিবর্তে এতে রয়েছে DNA-এর বিভিন্ন অংশ, পানি, লবণ এবং একটি DNA স্ক্যাফোল্ড বা কাঠামো।
নতুন কম্পিউটারের বৈশিষ্ট্য
- প্রযুক্তি: DNA-ভিত্তিক মলিকিউলার কম্পিউটিং
- গবেষণা প্রতিষ্ঠান: মেনুথ বিশ্ববিদ্যালয়, আয়ারল্যান্ড
- প্রকাশনা: Nature
- হিসাব: যোগ, গুণ, ভাগসহ বিভিন্ন গাণিতিক কাজ
- উপাদান: DNA, পানি ও লবণ
- বিদ্যুৎ: হিসাব চালানোর জন্য একটানা বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রয়োজন হয় না
কীভাবে কাজ করে এই কম্পিউটার
গবেষকেরা একটি টেস্ট টিউবে অল্প পরিমাণ পানি ও লবণের সঙ্গে DNA-এর ছোট ছোট অংশ এবং একটি বড় DNA কাঠামো যুক্ত করেন। এরপর মিশ্রণটিকে নির্দিষ্টভাবে গরম ও ঠান্ডা করা হয়।
এই প্রক্রিয়ায় DNA অণুগুলো পরস্পরের সঙ্গে নির্দিষ্টভাবে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন কাঠামো তৈরি করে। সেই কাঠামোর মধ্যেই হিসাবের ফল পাওয়া যায়। অর্থাৎ প্রচলিত কম্পিউটারে যেখানে ইলেকট্রনিক সংকেতের মাধ্যমে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ হয়, এখানে অণুগুলোর পারস্পরিক ক্রিয়াই গণনার কাজ সম্পন্ন করে।
গবেষকদের মতে, হিসাব শুরু করার জন্য সামান্য তাপ প্রয়োজন হলেও পুরো প্রক্রিয়া চালিয়ে নিতে একটানা শক্তি সরবরাহের প্রয়োজন নেই। এটিই এই প্রযুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
এক ফোঁটা তরলেই বিপুল DNA
গবেষণা দলের সদস্যদের মতে, খুব অল্প পরিমাণ তরলের মধ্যেই কোটি কোটি, এমনকি কয়েক ট্রিলিয়ন DNA অণু থাকতে পারে। এসব অণু একে অপরের সঙ্গে নির্দিষ্ট নিয়মে মিথস্ক্রিয়া করে এবং শেষ পর্যন্ত একটি ফল তৈরি করে।
গবেষকেরা এই ব্যবস্থায় ১০টি আলাদা প্রোগ্রাম চালিয়েছেন। এর মধ্যে ১০০-বিটের হিসাবও ছিল। একটি পরীক্ষায় প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ থেকে ৩ কোটি ৪০ লাখ পর্যন্ত সংখ্যার যোগ করতে সর্বোচ্চ ১৪ ঘণ্টা সময় লেগেছে। অন্যদিকে ১০ ও ৩ যোগ করার একটি ছোট হিসাব মাত্র ৩০ সেকেন্ডে সম্পন্ন হয়েছে।
বারবার ব্যবহার করা সম্ভব
DNA কম্পিউটিংয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত উপাদান একবারের বেশি ব্যবহার করা কঠিন হওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মেনুথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের তৈরি ব্যবস্থায় সেই সীমাবদ্ধতা কিছুটা কাটিয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা গেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, একই DNA কম্পিউটার ধারাবাহিকভাবে ২৫টি পর্যন্ত আলাদা হিসাব করতে সক্ষম হয়েছে। গবেষকদের দাবি, অন্যান্য DNA কম্পিউটারের তুলনায় তাঁদের ব্যবস্থাটি দ্রুত এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য।
তবে এটি প্রচলিত কম্পিউটারের বিকল্প নয়: গবেষকেরা জানিয়েছেন, DNA কম্পিউটার সিলিকন কম্পিউটারের মতো দ্রুত নয়। এর উদ্দেশ্যও প্রচলিত কম্পিউটারকে সরাসরি প্রতিস্থাপন করা নয়। বরং এটি কম শক্তি ব্যবহারকারী মলিকিউলার কম্পিউটিংয়ের একটি নতুন পথ দেখাচ্ছে।
ভবিষ্যতে কোথায় কাজে লাগতে পারে
গবেষকদের মতে, DNA-ভিত্তিক কম্পিউটিংয়ের সম্ভাব্য ব্যবহার শুধু গাণিতিক হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘমেয়াদি তথ্য সংরক্ষণ, কম শক্তি ব্যবহার করে কম্পিউটিং এবং মলিকিউলার পর্যায়ে তথ্য প্রক্রিয়াকরণের মতো ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে।
আরও দূরের সম্ভাবনা হিসেবে জীবন্ত কোষের ভেতরে কাজ করতে পারে এমন মলিকিউলার কম্পিউটিং ব্যবস্থার কথাও গবেষকেরা বিবেচনা করছেন। এমন প্রযুক্তি ভবিষ্যতে রোগ শনাক্তকরণের মতো কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে। তবে এই ধরনের ব্যবহার এখনো গবেষণা ও উন্নয়নের পর্যায়ে রয়েছে।
কম শক্তির কম্পিউটিংয়ের নতুন সম্ভাবনা
বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উচ্চক্ষমতার কম্পিউটিংয়ের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কম্পিউটারের শক্তি ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেই জায়গায় প্রচলিত সিলিকন প্রযুক্তির পাশাপাশি বিকল্প কম্পিউটিং পদ্ধতি নিয়ে গবেষণাও বাড়ছে।
মেনুথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষণা সেই বিকল্প ধারারই একটি উদাহরণ। DNA-এর মতো জৈব অণুকে তথ্য প্রক্রিয়াকরণের কাজে ব্যবহার করে গবেষকেরা দেখিয়েছেন, কম্পিউটিংয়ের ধারণা শুধু চিপ ও ইলেকট্রনিক সার্কিটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
তবে এই প্রযুক্তিকে বাস্তব জীবনের বড় পরিসরের কম্পিউটিং ব্যবস্থায় ব্যবহার করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। গতি, নির্ভুলতা, উৎপাদন খরচ, স্বয়ংক্রিয়তা এবং বড় পরিসরে ব্যবহারের মতো বিষয়গুলো এখনো গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ক্ষেত্র।
বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, DNA-ভিত্তিক কম্পিউটিং নিয়ে আরও গবেষণার মাধ্যমে ভবিষ্যতে কম শক্তি ব্যবহারকারী এবং বিশেষায়িত মলিকিউলার কম্পিউটিং ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব হবে।

