১৭ পয়সা ভাড়া বাড়লেও যাত্রীর কাছ থেকে ১০ টাকা বেশি!

Avatar
মানচিত্র
26 Sep, 2026• 4 min read• 1 Views
১৭ পয়সা ভাড়া বাড়লেও যাত্রীর কাছ থেকে ১০ টাকা বেশি!

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর বাসভাড়া কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়িয়েছে সরকার। নতুন ভাড়া অনুযায়ী ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বড় বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা হয়েছে। মিনিবাসের ক্ষেত্রে ভাড়া ২ টাকা ৪৩ পয়সা থেকে ২ টাকা ৬০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। দূরপাল্লার বাসের ভাড়াও প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়িয়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা করা হয়েছে।

তবে সরকারি সিদ্ধান্তের সঙ্গে বাস্তব চিত্রের ব্যবধান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। রাজধানীর বিভিন্ন রুটে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কয়েক টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ করছেন যাত্রীরা। কোথাও ১০ টাকার ভাড়া ১৫ টাকা, আবার কোথাও ২০ টাকার ভাড়া ২৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

সরকারি হিসাবে নতুন ভাড়া

  • ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের বাস: প্রতি কিলোমিটার ২.৫৩ টাকা থেকে ২.৭০ টাকা
  • ঢাকা ও চট্টগ্রামের মিনিবাস: প্রতি কিলোমিটার ২.৪৩ টাকা থেকে ২.৬০ টাকা
  • দূরপাল্লার বাস: প্রতি কিলোমিটার ২.২৩ টাকা থেকে ২.৪০ টাকা
  • মহানগরের বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া: ১০ টাকা
  • মহানগরের মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া: ৮ টাকা

কিলোমিটারে বাড়ল ১৭ পয়সা

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর ২২ সেপ্টেম্বর নতুন বাসভাড়া নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ডিজেলচালিত বাস ও মিনিবাসের ভাড়া বিভিন্ন রুটে প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়ানো হয়েছে।

সরকারি সিদ্ধান্তের আগে পরিবহন মালিকদের পক্ষ থেকে প্রতি কিলোমিটারে ২০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর দাবি করা হয়েছিল। তবে আলোচনার পর সরকার ১৭ পয়সা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয়। নতুন ভাড়া ২২ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর করা হয়েছে।

এর ফলে ঢাকার মতো মহানগরে বাসে প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ২ টাকা ৭০ পয়সা এবং দূরপাল্লার রুটে ২ টাকা ৪০ পয়সা নির্ধারিত হয়েছে। সরকারি প্রজ্ঞাপনে বাস ও মিনিবাসে দৃশ্যমান স্থানে নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা প্রদর্শনের কথাও বলা হয়েছে।

কাগজে ১৭ পয়সা, বাস্তবে বাড়তি ৫ থেকে ১০ টাকা

নতুন ভাড়া কার্যকর হওয়ার পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু রুটে আগের ভাড়ার তুলনায় ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি চাওয়া হচ্ছে।

মিরপুর, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার ও শাহবাগসহ কয়েকটি এলাকায় যাত্রীদের কাছ থেকে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা চাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। একটি প্রতিবেদনে সাগুফতা মোড় থেকে মিরপুর-১০ নম্বর পর্যন্ত ১০ টাকার ভাড়ার পরিবর্তে ১৫ টাকা চাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আবার শাহবাগ থেকে গাবতলী রুটে ২০ টাকার জায়গায় ৩০ টাকা চাওয়ার অভিযোগও এসেছে। 1

এ ধরনের ঘটনায় যাত্রী ও বাসকর্মীদের মধ্যে তর্কাতর্কির পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কোথাও কোথাও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

যাত্রীদের অভিযোগ: সরকারি হিসাবে ভাড়া কিলোমিটারে মাত্র ১৭ পয়সা বাড়লেও অনেক রুটে যাত্রীপ্রতি কয়েক টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। ফলে স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদের ওপর তুলনামূলক বেশি চাপ পড়ছে।

কেন এত পার্থক্য?

বাসভাড়া কিলোমিটারভিত্তিক হওয়ায় ১৭ পয়সার বৃদ্ধি পুরো যাত্রার ক্ষেত্রে খুব বড় অঙ্কের পরিবর্তন হওয়ার কথা নয়। তবে একজন যাত্রীকে মোট কত টাকা দিতে হবে, সেটি নির্ভর করে তার যাত্রাপথের দূরত্ব, বাসের ধরন এবং সংশ্লিষ্ট রুটের অনুমোদিত ভাড়ার ওপর।

দূরপাল্লার বাসের ক্ষেত্রেও আসনসংখ্যা একটি বিষয়। নির্ধারিত আসনের চেয়ে কম আসনে কোনো বাস পরিচালিত হলে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী আনুপাতিকভাবে ভাড়া পুনর্নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে। তবে এ ধরনের ভাড়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন।

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই। নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা বাসের দৃশ্যমান স্থানে রাখার নির্দেশনাও রয়েছে।

সরকারের হুঁশিয়ারি

নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকেও সতর্ক করা হয়েছে। পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বেশি নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট পরিবহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ক্ষেত্রে জরিমানা এবং ভবিষ্যতে রুট পারমিটের বিষয়েও কঠোরতা আসতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন। 2

সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন মালিকদের ভাড়া বাড়ানোর দাবি ছিল প্রতি কিলোমিটারে ২০ পয়সা। আলোচনার পর সেই দাবি কমিয়ে ১৭ পয়সা নির্ধারণ করা হয়।

ডিজেলের দাম বেড়েছে ২০ টাকা

বাসভাড়া সমন্বয়ের পেছনে মূল কারণ হিসেবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্তের আগে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়। এর ফলে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর পরিবহন মালিকরা পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কথা তুলে ধরে বাসভাড়া সমন্বয়ের দাবি জানান। সরকার সেই দাবির একটি অংশ বিবেচনায় নিয়ে নতুন ভাড়া নির্ধারণ করেছে। 3

শুধু ভাড়া নয়, যাত্রীদের আরেক সমস্যা ভাড়ার তালিকা

নতুন ভাড়া কার্যকরের পর যাত্রীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো অনুমোদিত ভাড়ার তালিকা। সরকারি নির্দেশনায় প্রতিটি বাস ও মিনিবাসের দৃশ্যমান স্থানে নতুন ভাড়ার তালিকা রাখার কথা বলা হয়েছে।

কিন্তু তালিকা না থাকলে যাত্রীরা প্রকৃত ভাড়া সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন না। তখন চালক বা হেলপারের দাবি করা ভাড়াই অনেক সময় দিতে বাধ্য হন তারা। এ কারণে ভাড়ার তালিকা প্রদর্শন এবং নিয়মিত তদারকি কার্যকর করার দাবি উঠছে।

ঢাকার বিভিন্ন রুটে ভাড়ার তালিকা নিয়ে অস্পষ্টতা থাকায় যাত্রীদের সঙ্গে পরিবহনকর্মীদের বিরোধের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর করার জন্য মাঠপর্যায়ে নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

দূরপাল্লার বাসেও বাড়তি ভাড়ার অভিযোগ

শুধু রাজধানীর নগর পরিবহন নয়, দূরপাল্লার কিছু রুটেও অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ঢাকা থেকে কয়েকটি গন্তব্যের টিকিটে নির্ধারিত ভাড়ার তুলনায় কয়েক দশ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সব পরিবহনে একই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে না। কিছু পরিবহনে নির্ধারিত বা আগের ভাড়াতেই টিকিট বিক্রির তথ্যও এসেছে। 4

তাই কোনো একটি পরিবহনের ঘটনা দিয়ে পুরো পরিবহন খাতের চিত্র নির্ধারণ করা যায় না। তবে নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে টাকা নেওয়ার অভিযোগ থাকলে সেটি যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

যাত্রীদের জন্য কী জানা জরুরি?

নতুন ভাড়া ব্যবস্থায় যাত্রীদের প্রথমে রুট ও দূরত্ব অনুযায়ী অনুমোদিত ভাড়া সম্পর্কে ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। বাসে ভাড়ার তালিকা থাকার কথা। অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হলে যাত্রীরা সম্ভব হলে রুটের নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা দেখতে চাইতে পারেন।

তবে পরিস্থিতি উত্তপ্ত না করে অভিযোগের প্রমাণ সংরক্ষণ করা বেশি কার্যকর হতে পারে। টিকিট থাকলে সেটি রাখা, পরিবহনের নাম ও রুট নোট করা এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করা যেতে পারে।

মূল বিষয় এক নজরে

  • সরকার বাস ও মিনিবাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়িয়েছে।
  • ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বড় বাসের ভাড়া এখন প্রতি কিলোমিটার ২.৭০ টাকা।
  • মহানগরের বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা এবং মিনিবাসের ৮ টাকা।
  • কিছু রুটে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ এসেছে।
  • সরকার অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কতা দিয়েছে।
  • বাস ও মিনিবাসে অনুমোদিত ভাড়ার তালিকা দৃশ্যমান স্থানে রাখার নির্দেশ রয়েছে।

ভাড়ার নিয়ম মানানো এখন বড় প্রশ্ন

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর বাসভাড়া সমন্বয় করা হলেও নতুন ভাড়া বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সরকারি হিসাবে বৃদ্ধি হয়েছে প্রতি কিলোমিটারে ১৭ পয়সা। কিন্তু যাত্রীরা যদি স্বল্প দূরত্বেও অতিরিক্ত কয়েক টাকা দিতে বাধ্য হন, তাহলে ঘোষিত ভাড়ার সঙ্গে বাস্তব যাত্রা খরচের পার্থক্য আরও বাড়বে।

সরকারি নির্ধারিত ভাড়া ও পরিবহন মালিকদের পরিচালন ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য যেমন প্রয়োজন, তেমনি যাত্রীদের কাছ থেকে অনুমোদিত ভাড়ার বাইরে অর্থ আদায় বন্ধ করাও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত তদারকি, ভাড়ার তালিকা প্রদর্শন এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি থাকলে নতুন ভাড়া ব্যবস্থায় অনিয়ম কমানো সম্ভব হতে পারে।

এখন নজর থাকবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন রুটে নতুন ভাড়ার বাস্তব প্রয়োগের দিকে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারিত হলেও মাঠপর্যায়ে সেই ভাড়া কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত যাত্রীদের অভিজ্ঞতা নির্ধারণ করবে।

সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা, দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো এবং অন্যান্য প্রকাশিত প্রতিবেদন।

Avatar

মানচিত্র

Administrator of News Mancitro

Reader Comments (0)

No comments yet. Be the first to share your opinion!