প্রকাশের তারিখ : ০৮ জুলাই ২০২৬
সন্তানের প্রথম পাঠশালা—‘মা’
জন্মের পর একটি শিশুর প্রথম ও সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল মায়ের বুক। মায়ের কণ্ঠস্বর, স্পর্শ, স্নেহ ও মমতার মধ্য দিয়েই সে পৃথিবীকে চিনতে শেখে। ভাষা শেখার বহু আগেই সে মায়ের চোখের ভাষা পড়তে শেখে, ভালোবাসার অর্থ বুঝতে শেখে। এই নীরব শিক্ষাই তার চরিত্র গঠনের প্রথম ভিত্তি।শিশুর মন নির্মল শুভ্র সাদা কাগজের মতো। সেখানে যা লেখা হয়, তার ছাপ দীর্ঘদিন থেকে যায়। সত্যবাদিতা, শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা, সততা, পরিশ্রম, দেশপ্রেম ও মানবিকতা—এসব মূল্যবোধ কেবল পাঠ্যবইয়ের বিষয় নয়; এগুলোর চর্চা শুরু হয় পরিবারের প্রতিদিনের জীবনযাপনে। সন্তান মা-বাবার মুখের কথা যতটা শোনে, তার চেয়ে অনেক বেশি শেখে তাঁদের আচরণ দেখে। মা-বাবাকে অনুকরণ করাই তার কাছে যেনো এক আনন্দময় খেলা ; আর সেই খেলার মধ্য দিয়েই অজান্তে গড়ে ওঠে তার ব্যক্তিত্বের ভিত। একবাক্যে বলা যায়, “সন্তানই বাবা-মায়ের মূল্যবোধ, চরিত্র ও জীবনাচরণের প্রথম প্রতিচ্ছবি”।আজকের সমাজে প্রায়ই শিশু-কিশোরদের অপরাধ, সহিংসতা, মাদকাসক্তি, সাইবার অপরাধ কিংবা নৈতিক অবক্ষয়ের সংবাদ দেখি। এসব ঘটনা আমাদের উদ্বিগ্ন করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—একটি শিশুর হৃদয়ে মানবিকতার বীজ কতটা রোপণ করতে পেরেছি আমরা? তাকে কি শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার শিক্ষা দিয়েছি, নাকি একজন ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষাও দিয়েছি?অবশ্য একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন—সন্তান বিপথে গেলেই তার সব দায় মায়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত নয়। শিশুর বিকাশে বাবার ভূমিকা, পারিবারিক পরিবেশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বন্ধুমহল, সামাজিক বাস্তবতা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং রাষ্ট্রের নীতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একজন সুনাগরিক গড়ে তোলা পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। এটি একদিনের কোনো উদ্যোগ নয়; বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলমান একটি অবিরাম সামাজিক অঙ্গীকার।তারপরও দিনশেষে কিছু কথা থাকে, সন্তানের ভলোমন্দ বিশ্লেষণে একজন মায়ের ভূমিকা অনন্য। কারণ তিনিই সন্তানের প্রথম শিক্ষক, প্রথম বন্ধু এবং প্রথম নৈতিক পথপ্রদর্শক। একজন সচেতন মা সন্তানের সঙ্গে সময় কাটান, তার মনের কথা শোনেন, ভুল করলে ভালোবাসা দিয়ে শুধরে দেন এবং নিজের জীবনাচরণের মধ্য দিয়েই তাকে শিক্ষা দেন। এই শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। যে মা তাঁর সন্তানকে সত্যিকার অর্থে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন না-প্রকৃত অর্থে সমাজ-সংসারে তার অবস্থান;নিন্দনীয়।তবে যিনি পারেন, তিনিই প্রকৃত রত্নগর্ভা।আমরা প্রায়ই সন্তানের পেশাগত সাফল্যকে জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন মনে করি। কিন্তু একজন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিচারক কিংবা প্রশাসক হওয়ার আগে একজন মানুষকে মানুষ হতে হয়। জ্ঞান মানুষকে দক্ষ করে, কিন্তু মূল্যবোধ তাকে মহৎ করে। আর একজন মহৎ সন্তান কেবল একটি পরিবারের নয়, সমগ্র সমাজের সম্পদ। তার জীবনই হয়ে ওঠে মূল্যবোধের এক নীরব বার্তা; আর সে বহন করে তার প্রথম পাঠশালার সর্বোত্তম পরিচয়।একটি সভ্য সমাজ গড়তে হলে আমাদের এমন সন্তান গড়ে তুলতে হবে, যারা কেবল মেধাবী নয়—সৎ, দায়িত্বশীল, সহনশীল ও মানবিক। কারণ একটি শিশুর সুন্দর চরিত্রই একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ।আজকের শিশুরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে। তাই তাদের হাতে শুধু প্রযুক্তি নয়, তুলে দিতে হবে নৈতিকতার আলো। শুধু প্রতিযোগিতা নয়, শেখাতে হবে সহমর্মিতা। শুধু সফল হওয়ার স্বপ্ন নয়, শেখাতে হবে সৎ থাকার সাহস। তবেই আলোকিত হবে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং সমগ্র মানবসভ্যতা।মায়ের কোলই একটি শিশুর প্রথম পাঠশালা। সেই পাঠশালার শিক্ষা যদি মানবিকতা, সততা ও ভালোবাসায় সমৃদ্ধ হয়, তবে আগামী দিনের সমাজও হবে আরও সুন্দর, আরও সমৃদ্ধ। বারবার বলতে হচ্ছে, একজন সন্তান যখন পথ হারায়, তখন কেবল একটি জীবনই বিপথে যায় না; আহত হয় একটি পরিবার । ম্লান হয় তার প্রথম পাঠশালার শিক্ষা, আর তার নেতিবাচক অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতির ভবিষ্যতের ওপর।সকল সন্তানের জন্য রইল আন্তরিক শুভকামনা।‘মা’ নামের সেই প্রথম পাঠশালা অতন্দ্র প্রহরী হয়ে বেঁচে থাক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।মায়ের আঁচলের প্রতিটি সুতা হয়ে উঠুক প্রতিটি সন্তানের জীবনের প্রথম আলোকশিখা।ন. নাহার আনছারী এডভোকেট (কবি,লেখক,গীতিকার, বিশ্লেষক, সমাজসেবক ও সংগঠক।)
কপিরাইট © ২০২৬ মানচিত্র । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত