প্রকাশের তারিখ : ১১ জুন ২০২৬
চেয়ারম্যান-মেম্বারদের 'জনবান্ধব' রূপরেখা: কেমন হওয়া উচিত আদর্শ জনপ্রতিনিধিদের আচরণ ও এলাকার উন্নয়ন?"
স্টাফ রিপোর্টার মো:রাজু আহমেদ, অললাইন সাংবাদিক ও প্রোগ্রাম অর্গানাইজার টিএমএসএস। ( ৪ নং ঘোগাদহ ইউনিয়ন পরিষদ ) কুড়িগ্রাম সদর কুড়িগ্রামইতিমধ্যে জানতে পারলাম ৪ নং ঘোগাদহ ইউনিয়ন পরিষদের কয়েক জন চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী তাদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা এবং ব্যক্তিগত মতামত জানাবেন আপনারা কাকে এবার চেয়ারম্যান হিসেবে দেখতে চান। একটি ইউনিয়ন তখনই আদর্শ বা 'মডেল ইউনিয়ন' হিসেবে গড়ে ওঠে, যখন সেই এলাকার জনপ্রতিনিধিরা নিজেদের 'শাসক' নয়, বরং জনগণের 'সেবক' মনে করেন। ভোটের সময় ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে হাত জোড় করে ভোট চাওয়ার দৃশ্য এদেশের চিরচেনা রূপ। কিন্তু ভোট শেষ হওয়ার পর সেই চেনা রূপটা কতটা বজায় থাকে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন রয়েছে। একজন চেয়ারম্যান বা মেম্বার কীভাবে জনগণের হৃদয়ে আজীবন বেঁচে থাকতে পারেন, তা নিয়ে আজকের এই বিশেষ আয়োজন।আমাদের গ্রামীণ রাজনীতির সবচেয়ে বড় নির্মম বাস্তবতা হলো—নির্বাচনের আগে ভোটারদের কদর থাকে আকাশের সমতুল্য। তখন চেয়ারম্যান-মেম্বার পদপ্রার্থীরা সাধারণ মানুষের হাত-পা ধরে, বুকে বুক মিলিয়ে 'ভাই', 'দুলাভাই', 'চাচা' বলে ডেকে পুরো এলাকা মাথায় তোলেন। চা-দোকানের বিল দেওয়া থেকে শুরু করে মানুষের সুখ-দুঃখে দিন-রাত এক করে ফেলার অভিনয় চলে অবিরত। তখন মুখে শুধু একটাই খই ফোটে—"ভাই, এবার একটা সুযোগ দেন, আপনাদের সব রাস্তাঘাট করে দেবো, ঘরে ঘরে উন্নয়ন পৌঁছে দেবো।"কিন্তু যেই মুহূর্তে ভোট শেষ হয় আর তারা চেয়ারম্যান-মেম্বারের চেয়ারে বসেন, অমনি যেন জাদুর মতো তাদের চেনা রূপটা গায়েব হয়ে যায়! যে সাধারণ মানুষগুলো দিন-রাত খেটে তাদের চেয়ারে বসালো, নির্বাচনের পর সেই মানুষগুলোই যখন কোনো প্রয়োজনে ইউনিয়ন পরিষদে যায়, তখন তাদের সাথে দেখা করাটাই যেন আকাশের চাঁদ পাওয়ার মতো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কাজের সময় যারা আপন ভাই সেজেছিল, চেয়ারে বসার পর তারা সাধারণ মানুষের দিকে ফিরে তাকানোর সময়টুকুও পান না। জনগণের উদ্দেশ্যে তখন তাদের আচরণ বদলে যায়, মুখের মিষ্টি ভাষা হয়ে যায় কর্কশ। এই যে ভোটের আগে 'আকাশচুম্বী প্রতিশ্রুতি' আর ভোট শেষে 'চরম অবহেলা'—জনপ্রতিনিধিদের এই দ্বিচারিতা সাধারণ মানুষকে দিন দিন রাজনীতি ও উন্নয়নের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলতে বাধ্য করছে।জনপ্রতিনিধিদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তাদের সুন্দর আচরণ। একজন রিকশাচালক, দিনমজুর বা সাধারণ কৃষক যখন বুকভরা আশা নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদে যান, তখন চেয়ারম্যান বা মেম্বারদের একটি মিষ্টি কথাই তাদের অর্ধেক কষ্ট দূর করে দিতে পারে।চেয়ারম্যান বা মেম্বারদের এমন হতে হবে যেন সাধারণ মানুষ যেকোনো প্রয়োজনে, যেকোনো সময় তাদের কাছে পৌঁছাতে পারে। এলাকার মানুষের অভাব-অভিযোগ মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। ধমক বা অবহেলার সুর মানুষের মন ভেঙে দেয়, আর একটু সহানুভূতিশীল আচরণ আজীবনের জন্য ভোটারদের আপন করে নেয়।একটি ইউনিয়নের সার্বিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন নির্ভর করে মেম্বার এবং চেয়ারম্যানের সদিচ্ছার ওপর।কাঁচা রাস্তা পাকা করা, ভাঙা কালভার্ট মেরামত এবং বর্ষাকালে যেন মানুষের চলাচল ব্যাহত না হয়, সেই ব্যবস্থা করা জনপ্রতিনিধিদের প্রধান দায়িত্ব।সরকারি যেকোনো বরাদ্দ (যেমন: কাবিখা, টিআর, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, ওএমএস কার্ড) যেন প্রকৃত অভাবী মানুষেরা পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এখানে স্বজনপ্রীতি বা দুর্নীতির কোনো স্থান থাকা চলবে না।উন্নয়ন মানে শুধু ইট-পাথরের রাস্তাঘাট নয়, মানুষের জীবনের মান উন্নয়ন।এলাকার তরুণ সমাজকে বাঁচাতে মাদক এবং বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে চেয়ারম্যান-মেম্বারদের জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।গ্রাম্য বিবাদ বা শালিস-বিচারে কোনো দলের বা প্রভাবশালীর পক্ষ না নিয়ে, একদম নিরপেক্ষভাবে ন্যায়বিচার করতে হবে। গরিব মানুষ যেন টাকার অভাবে বিচার থেকে বঞ্চিত না হয়।আজকের বাস্তবতায় দেখা যায়, নির্বাচনের আগে বড় বড় ইশতেহার দেওয়া হলেও, নির্বাচনের পর অনেক চেয়ারম্যান-মেম্বারের রূপ বদলে যায়। এলাকার প্রধান প্রধান রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা, বর্ষা এলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের যাওয়ার উপায় থাকে না, অথচ জনপ্রতিনিধিদের নিজেদের বাড়ির রাস্তা ঠিকই চকচকে হয়ে যায়। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় এলাকার উন্নয়ন হওয়ার কথা থাকলেও, দেখা যায় জনপ্রতিনিধিদের নিজেদের পারিবারিক ও বংশগত ভাগ্য রাতারাতি বদলে যাচ্ছে। কাঁচা বাড়ি পাকা হচ্ছে, বিশাল দালানকোটা উঠছে।সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো 'স্বজনপ্রীতি'। সরকারি ঘর, ভিজিডি-ভিজিএফ কার্ড, কিংবা কর্মসংস্থানের সুযোগ সুবিধাগুলো সাধারণ ও প্রকৃত গরিব মানুষেরা পায় না। এগুলো বণ্টন করা হয় চেয়ারম্যান-মেম্বারদের নিজস্ব আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে। যার ফলে ধনী আরও ধনী হচ্ছে, আর সাধারণ জনগণ অবহেলিতই থেকে যাচ্ছে। রাস্তাঘাট এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ খাতের বরাদ্দ যখন ব্যক্তির পকেটে বা তার আত্মীয়দের সুখে ব্যয় হয়, তখন জনগণের মনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এই ধারা চলতে থাকলে তারা শুধু জনগণের বিশ্বাসই হারাবেন না, বরং ইতিহাসের পাতায় খলনায়ক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবেন।ইউনিয়নের স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার পরিবেশ ঠিক রাখা এবং ঝরে পড়া রোধে জনপ্রতিনিধিদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখা উচিত। এছাড়া এলাকার বেকার যুবকদের জন্য বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে তাদের স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।একটি ইউনিয়নকে ঢেলে সাজাতে যেমন সৎ জনপ্রতিনিধি প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন এমন কিছু দূরদর্শী মানুষ যারা জনগণের পালস বা মনের ভাষা বোঝেন। আজ যারা ক্ষমতায় থেকে জনগণের সাথে দূরত্ব তৈরি করছেন, তারা হয়তো বুঝতে পারছেন না যে আধুনিক যুগ ডিজিটাল প্রচারণার যুগ। বর্তমানে সাধারণ মানুষ আর অন্ধের মতো ভোট দেয় না; তারা দেখে কার পরিকল্পনা কতটা গোছানো এবং কে তাদের সুখ-দুঃখের কথা সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারছে।আগামী দিনে যারা এই ইউনিয়নের হাল ধরতে চান, সেইসব হবু চেয়ারম্যান ও মেম্বার প্রার্থীদের এখন থেকেই সচেতন হতে হবে।
কপিরাইট © ২০২৬ মানচিত্র । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত